গল্পসাপ্তাহিক সংকলন

গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-৪)

বারো

দোলনের আজ শাড়ী পরতে ইচ্ছে হয়েছে। তাই সে বিকেলে হলুদ সুতোয় কাজ করা কলাপাতা রঙা একটা সুতি শাড়ী পরেছে। চোখে গাঢ় কাজল আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক পরেছে। হাতে সবুজ রেশমি চুড়ি পরে সোজা রান্নাঘরে যায়। তারপর চা করে নিয়ে ছাদে চলে আসে। তার নতুন গোলাপ গাছটায় ৪টা ফুল ফুটে আছে। সে একটা ফুল ছিঁড়ে তার চুলে গুঁজে দেয়। তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে পাশের ছাদে তাকাতেই দেখে শামীম গাছের কাছে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। তার সম্পূর্ণ খেয়াল টবে লাগানো বেলিফুল গাছটার দিকে। দোলন একটা মুচকি হাসি দিয়ে চেঁচিয়ে বলল,

– ও হ্যালো, আপনি কি রোজই ছাদে আসেন?

শামীম ডাক শুনে তাকাতেই তার চোখ আটকে যায়, এ যে জীবনানন্দের আস্ত কবিতা! মুহূর্তেই তার মনে হল, তার পেছনে দাঁড়িয়ে দুজন ভায়োলিন বাজাচ্ছে আর স্লো মোশনে হালকা বাতাসে তার চুল উড়ছে। শামীমের অমন তাকিয়ে থাকা দেখে দোলন বলল,

– এই যে মিস্টার হোদল কুতকুত, এভাবে তাকিয়ে থাকলে আপনি কিন্তু আমার প্রেমে পড়ে যাবেন।

শামীম তখন বাস্তবে এসে বলল,

– হোদল কুতকুতটা আবার কে? নাম জানতে চাইছেন সেটা সরাসরি বললেই হয়? আমি শামীম।

দোলন বলল,

– বাহ, আপনার নাম কে জানতে চাইছে? নাকি ভাবছেন আপনি আপনার নাম বললে আমি তখন আমার নামটা বলব? ভালো সুযোগ সন্ধানী দেখছি!

শামীম বলল,

– আমার সাথে যার এত গল্প করার ইচ্ছে তার নিশ্চই আমার নামটাও জানবার ইচ্ছে হবে?

দোলন বলল,

– আপনার সাথে গল্প করার ইচ্ছে আমার? এই সুসংবাদটা কে দিল আপনাকে?

শামীম বলল,

– আপনিই তো ডাকছিলেন!

দোলন বলল,

– আমি আপনাকে ডাকছিলাম এটা বলতে যে রোজ ছাদে উঠে এভাবে আমাকে দেখলে বাসায় গিয়ে নালিশ দিয়ে আসব।

শামীম বলল,

– ও তাই নাকি? আমার বাড়ির ছাদ, আমার চোখ আর আমার চোখ দিয়ে আমি যা খুশি দেখব তাতে আপনার কি? নিজেকে জীবনানন্দ দাসের কবিতা ভাবার কোন কারণ নেই, বুঝেছেন? আপনি বরং এটা ভাবুন যে, আমি যদি আপনার বাড়ি গিয়ে বলি আপনি রোজ গরুর মতন চোখ দিয়ে আমাকে অত্যাচার করেন তখন কি হবে?

দোলন বলল,

– ও তাই? আচ্ছা কে কি করতে পারে সেটা দেখা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আর জীবনানন্দ দাসের কবিতা তো আপনি আমায় ভাবছেন তাই বললেন। নয়ত আমি তো নিজেকে রবিঠাকুরের কবিতা ভাবি।

বলে দোলন চলে যাচ্ছিল শামীম তখন চেঁচিয়ে বলল,

– যাবার আগে নামটা তো বলে যান? নালিশ করবার সময় কার নামে নালিশ দিচ্ছি সেটা তো জানতে হবে নাকি? আচ্ছা রবিঠাকুরের কবিতাই নাহয় বলব। কিন্তু কোন কবিতার নামে ডাকব সেটা তো বলে যান? বধূ, শ্যামা নাকি নাগ কুমারী?

দোলন তখন বলল,

– কেন, হোদল কুতকুতের প্রতিবেশী বলবেন।

শামীম তখন হা হা করে হাসল আর ভাবল, মেয়েটা অন্যরকম!


নিচের গল্প গুলো পড়ে দেখতে পারেন –


তেরো

রাতে খাবার টেবিলে বসে শিরিন সুলতানা ঘোষণা করলেন শামীমের টালবাহানা আর মানা যাচ্ছে না। তাকে অতি শিঘ্রই বিয়ে করতে হবে। পাত্রী তার বন্ধুরই মেয়ে। এই সপ্তাহেই তারা মেয়ের বাসায় গিয়ে আংটি পরিয়ে আসবে এবং বিয়ের দিন তারিখ পাকা করে আসবে। এটাই ফাইনাল। খাবার টেবিলে ধুন্ধুমার লেগে গেল। শামীমের কোন কথাই কানে নেয়া হচ্ছে না। শুভ আনন্দে পারলে উঠে নাচতে শুরু করে। শামীম বলল,

– ঠিক আছে মা তুমি যা ভালো মনে করো।

শুভ বলল,

– মা ভাইয়ার তো সব ফাইনাল করলে আমার হিল্লে কবে করবে?

শিরিন সুলতানা বললেন,

– মেরে সব ক’টা দাঁত ফেলে দিয়ে তোমার হিল্লে করব পাজি কোথাকার।

শুভ তখন মন খারাপ করে বলল,

– আজ আমজনতা বলে এভাবে পদে পদে মার খেয়ে যেতে হচ্ছে। আফসোস, বিরাট আফসোস।

রাতে ঘুমুতে যাবার আগে অফিসের কিছু কাজ গুছিয়ে নিয়ে বিছানায় যেতেই বিয়ের কথা শামীমের মাথায় আসে। বিয়ে নিয়ে শামীমের ভেতর একটু ভয় কাজ করে। আজকালকার অধিকাংশ মেয়েগুলো তো মেয়ে না একেকটা সাক্ষাত ফ্যাশনের দোকান। সারাদিন সেল্ফি, ফেসবুকিং আর শপিং এর বাইরে এদের আলাদা কোন জীবন নেই যেন! এরা কি জানে, কি করে দু’কাপ চা নিয়ে একটা মধুর সন্ধ্যা বারান্দায় বসে কাটানো যায়? কি করে এক গামলা মুড়ি মাখানোর সাথে দারুণ একটা ফ্যামিলি আড্ডা হয়?

আচ্ছা, মেয়েটা যদি খোলামেলা মনের না হয়? ওদের মা-ছেলের সুন্দর ছোট্ট সুখের পৃথিবীটা যদি এলোমেলো করে ফেলে? যে আসবে সে কি পারবে তাদের সবাইকে আগলে রাখতে? এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যায় সে।

দু’দিন পর শিরিন সুলতানা শামীমকে বলেন,

– আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবি। তোকে নিয়ে বের হব, আংটি কিনব। আমি আমার বান্ধুবীর সাথে কথা বলেছি। পরশুদিন শুক্রবার, আমরা ঠিক করেছি সেদিনই তোদের দেখা হবে এবং আংটি পরানো হবে।

শামীম বলল,

– মা সব কিছু একটু বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?

শিরিন সুলতানা বললেন,

– মোটেও না। আমার তো দিনই ফুরাচ্ছে না। এত মিষ্টি আর লক্ষ্মী মেয়ে! কবে এসে আমার বাড়ি আলো করবে আমার শুধু সেই অপেক্ষা।

শামীম বলল,

– ঠিক আছে অফিস শেষ হলে আমি ফোন করব তুমি তৈরি থেকো।


এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –


চৌদ্দ

শুক্রবার আসতেই শামীমের হঠাৎ অফিসের একটা জরুরি কাজ পড়ে যায়। সে কোন ভাবেই ম্যানেজ করতে পারে না, কি করা প্রাইভেট জব। তাকে যেতেই হবে। শামীম তার মাকে বলল,

– মা, তুমি আর শুভ গিয়ে সব করে আসো কোন সমস্যা নেই।

শিরিন সুলতানা বলেন,

– তাই হয় নাকি গাধা? তুই একটাবার দেখবি না কাকে বিয়ে করছিস? পরে যদি তোর ভালো না লাগে? এটা সারা জীবনের ব্যাপার। দরকার হলে আমরা অন্যদিন যাই?

শামীম বলল,

– মা, তোমার উপর আমার পুরো আস্থা আছে। আর যেখানে মেয়ে তোমার এত পছন্দ হয়েছে সেখানে আমার কোন কথা বলার থাকতে পারে না। তাছাড়া আজ তারা হয়ত আয়োজন করে ফেলেছে। এই মুহূর্তে না করাটা খারাপ দেখায়। তিনি তোমার কাছের বান্ধুবী, কষ্ট পেতে পারে। তাই তোমরা যাও।

শিরিন সুলতানা আর কিছু বললেন না। শামীম অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়।

শামীম না আসায় শিরিন সুলতানার বান্ধুবী আর তার হাজবেন্ড দুজনই কষ্ট পেলেন। কিন্তু কিছু করার তো নেই। অবশ্য ফোনে দোলনের বাবার সাথে শামীম কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করে নিয়েছে। দুপুরে খাবারের আয়োজন ছিল। শিরিন সুলতানা তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছেন। আজ সব কিছু দোলন রেঁধেছে। খাওয়া শেষ হলে শিরিন সুলতানা তার বান্ধুবীকে বললেন,

– শুভ কাজে আর দেরি না করি, দোলনকে ডাক।

সেলিনা রহমান দোলনকে ডাকতে গেলেন। দোলন আজ মিষ্টি কালারের শাড়ী পরেছে। শাড়ীটা শিরিন সুলতানাই নিয়ে এসেছে আর বলেছে, আজ যেন এই শাড়ীটাই পরে। দোলন কখনোই ভারী সাজ দেয় না। আজও সে হালকা সাজ দিয়েছে। চুল খোঁপা বেঁধে তাতে জারবেরা ফুল গুঁজে দিয়ে তৈরি হয়েছে। সে আয়নার সামনে বসে বসে ভাবছে – মিস্টার হোদল কুতকুত, আমি তোমার জন্য কি অপেক্ষাটাই না করেছিলাম। অথচ তুমি আজ আসলে না! আমার খুব লেগেছে বুঝলে? এর শোধ আমি বিয়ের রাতে নেব, কড়ায়গণ্ডায় নেব।

[চলবে]

১১/০৪/২০২২, ০৯.৩০ PM

Shamima Zaman

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তৃষ্ণা হলো তার সাথে কথা বলার তৃষ্ণা। কথা আর হয় কই! আমার নৈশব্ধময় সকাল-দুপুর-বিকেল শব্দময় হয়ে রয়, মোবাইলের স্ক্রীনে, কালো অক্ষরে। আমি সেসব নিয়ে ব্লগে অক্ষরের মেলা সাজালাম। একটি করে দিন যায় আর মৃত্যুর দিকে আরও একটি দিন এগিয়ে যাই। হিসেবের খাতায় কী জমা হচ্ছে জানি না। আল্লাহর কাছে শুধু এটুকুই প্রার্থনা ভালো কিছু জমা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *