সম-আলোচনার সমালোচনা সমাচার
একটা সময় ছিলো সমালোচনা সবাই করতে চাইতো না। লেখালেখি করার চাইতে সমালোচনা করা ছিলো অনেক কঠিন। কিন্তু সময় পাল্টেছে বাংলালিংক এসেছে! আমরা এখন 4G থেকে 5G তে প্রবেশ করছি। অবশ্য 4G যদিও 3G এর সমান স্পিডও ঠিকমতো দিচ্ছেনা। আরে ধুর ধান ভাংতে শিবের গীত গাওয়ার মতো হয়ে যাচ্ছে! এসেছিলাম সমালোচনা নিয়ে লিখতে। যাকগে আসল কথায় ফিরে আসি।
বর্তমানে আমাদের দেশের সমালোচনা হচ্ছে শিবরাম চক্রবর্তীর উক্তির মতো – ‘যার মধ্যে আলোর ভাগ অল্প, চোনার ভাগ বেশি।’ আমি এতো জ্ঞানী নই যে সমালোচনা নিয়ে বড়সড় একটা বই লিখে ফেলবো। আসলে সমালোচনা নিয়ে লিখতে বসেছি কারণ আমাদের সমাজে সমালোচনা এখন গুরুতর রোগে পরিনত হয়েছে।
একটা গল্প বলি। এক এলাকার দুইজন লোকের ছেলে এক সঙ্গে লেখাপড়া করত। প্রথম জনের ছেলেটি ঠিকমতো লেখাপড়া করত না, তাই পরীক্ষার পর দেখা গেল তার ছেলে ফেল করেছে আর ২য় জনের ছেলে পাস করেছে। এতে প্রথম লোকটির মানসম্মান থাকে না। আরেকজন এই সুযোগে প্রথম ব্যক্তিটিকে একটু খোঁচানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না। সে ২য় ব্যক্তির ছেলেটির পাস করার খবরটি উল্লেখ করে বলে, শুনলাম অমুকের পোলায় বিরাট পাস দিছে।
প্রথম ব্যক্তিটি জবাব দেয়,
– পাস কইরা লাভ কী? চাকরি তো পাইব না।
কিন্তু দেখা গেল ছেলেটি ভালো একটা চাকরি পেল। এখন আবার ওই খোঁচানো স্বভাবের ব্যক্তিটি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রথম লোকটি বলে,
– চাকরি পেলে লাভ হইবো কী? বেতন তো পাইব না।
কিন্তু দেখা গেল মাস শেষে ভালো বেতন পেল! এবার ওই প্রথম ব্যক্তিটির মুখ থেকে শোনা গেল,
– বেতন পাইলে কী হইবে? ওই টাকা কোনো কাজে লাগবে না! সুখ পাইব না!
বোঝেন তাহলে!
পৃথিবীর সব দেশেই এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যারা অকারণে অন্যের নামে সমালোচনা করে। এই নিন্দুক ব্যক্তিদের সমালোচনার শিকার হয়ে অনেকেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। তাদের মনের ভেতর জন্ম নেয় অজানা এক ধরনের ভয় ও লজ্জা। স্যার উইনস্টন চার্চিল সমালোচনার কষ্টকে বলেছেন ‘শারীরিক ব্যথার চেয়েও বেশি’।
আবার আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যাদের সমালোচনা তাদের মনের মতো অর্থাৎ তাদের পক্ষে না গেলে খুবই ক্ষেপে যান। সমালোচনার নামে এখন দেশের এবং দলের লোক হলে তার জয়গান, না হলে তার সম্বন্ধে হয় কটূক্তি। সাহিত্য-সমালোচনার নামে যা হয় তা আরো ভয়াবহ। কোনো কোনো লেখক নিজেই নিজের সমালোচনার নামে নির্লজ্জ আত্মপ্রশংসা লিখে নিয়ে গিয়ে ছাপিয়েছে, এর নজির অনেক আছে।
সৎ সমালোচক যদি কেউ থাকেন, তিনি সমালোচনায় সততা অবলম্বন করলে এদেশের কাগজে বেশিদিন আর থাকবেন না। সমালোচক নামে বাংলাদেশে একদল আছেন যারা, গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল টাইপ। এখন সমালোচনা মানে হচ্ছে আপনার খুঁত অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। পাওয়া না গেলে মনগড়া ভাবে হলেও তৈরি করতে হবে। বুঝে হোক, না বুঝেই হোক সমালোচনা করতেই হবে। অবশ্য এই সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি। আস্তে আস্তে বহু সময় ধরে আমাদের মাঝে ঢুকে একেবারে গেড়ে বসে আছে।
সমালোচনা তো করা যায়। কিন্তু সমালোচনা হতে হবে যৌক্তিক ও গঠনমূলক। কিন্তু হায়রে সমালোচনা হায়রে দেশ। টকশোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় সমালোচনার কি হাল। টকশো আসরেই শুরু করে দেন হট্রগোল। ফেসবুকে নানা খারাপ ভাষায় সমালোচককে আক্রমন করে হয়রানি করেন। আর ভুলে যান সমালোচনা করে সমালোচকের কোন লাভ নেই বরং কিছুটা হলেও তার সময়ের ক্ষতি হয়।
আরো কিছু স্যাটায়ার ধর্মী লেখা পড়ুন –
আপনি লেখক হোন বা নেতা সমালোচনা সহ্য করার মন-মানসিকতা থাকতে হবে। জেফাসন বলেছেন, ‘সমালোচনাকে কখনো শত্রু ভেবো না, সে-ই তোমার প্রকৃত বন্ধু।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা, নিজের কথাই ঠিক। প্রয়োজনে মুখে না হলে হাত দিয়ে বোঝাবো এইরকম অবস্থা। অনেকটা ‘তেড়ে মেরে ডাণ্ডা করে দিব ঠাণ্ডা’।
মনে আছে ছোট বেলায় পড়েছিলাম সমালোচনা হল ‘সম আলোচনা’। সন্ধিবিচ্ছেদ করলে এটাই আসে। সমালোচক কিভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করবেন সে বিষয়ে সমালোচক অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সমালোচনার কথায়’ এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন – ‘ব্যক্তিগত ভাল লাগার ভাবোচ্ছ্বাস বা ভাল না লাগার নিরুচ্ছ্বাস ব্যস্ত থাকবেন না; তিনি যতসম্ভব নিস্পৃহ, নিরাসক্ত ও বস্তুগত দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্য বিচারে এমনভাবে প্রবৃত্ত হবেন যাতে পাঠকের সঙ্গে সাহিত্যের পরিচয়গত কোন বাধা, কোন আরোপিত নিয়মকানুনের বাঁধন না পড়ে।’ তিনি আরও বলেছেন,‘সমালোচকের মধ্যে দশটি গুণের সমাবেশ থাকতে হবে। সে দশটি গুণ হলো: ভূয়োদর্শন, আত্মসমালোচনা, সতর্কতা ও পরমতসহিষ্ণুতা, লেখকের প্রতি সহানুভুতি, মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান, দার্শনিক অন্তর্র্দৃষ্টি, বিশ্লেষণ নৈপুণ্য, যৌক্তিকতার প্রতি নিষ্ঠা, নিস্পৃহতা লেখকের চিত্তভূমিতে অধিষ্ঠিত হবার স্বাভাবিক সামর্থ।’
নাহ আর গভীরে যাবোনা। সমালোচনার ভালোমন্দ দুটো দিকই আছে। সমালোচনা যেমন মানুষের ভুল শুধরে দেয় আবার অনেক সময় তা মানুষের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। আমাদের দেশে প্রচলিত আছে যে, এখানে একজন মানুষের ক্ষতি করা অনেক সহজ কিন্তু কারো উপকার করা অনেক কঠিন ব্যাপার। আমাদের দেশে যোগ্যতাহীন ব্যাক্তিরাই এখন সমালোচনা বেশি করেন। তা সে টকশো বলেন আর এলাকার লোকজনের কথায় বলেন। আমাদের সমাজে এমনও অনেক মেধাবী মানুষ আছেন যারা এই সমালোচনার ভয়ে কিছু করতে সাহস পাননা। তারা ভাবেন এই বেশ ভালো আছি। তাদের উদ্দেশ্যে প্রয়াত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের একটা যুগান্তকারী কথা বলে আজকের লিখা শেষ করবো।
তিনি বলেছিলেন, ‘যারা সমালোচনা করছে তারা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যারা আঙুল উঁচু করে দেখিয়ে দিচ্ছে শক্ত মানুষটি কীভাবে হোঁচট খাচ্ছে তারাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। যারা বাইরে থেকে উপদেশ দিয়ে বেড়াচ্ছেন কীভাবে কাজটা আরও ভালোভাবে করা যেত তারাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। সব কৃতিত্ব হচ্ছে তার, যিনি আসলে সত্যিকার মাঠে নেমে যুদ্ধ করছেন। যার মুখ ও দেহ ধুলো, ঘামে ও রক্তে রঞ্জিত। যিনি জীবন দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যিনি বারবার ভুল করছেন এবং জয়ের একেবারে শেষ মাথায় এসে পৌঁছাচ্ছেন। যিনি চরম উৎসাহ, আগ্রহ, সাধনা নিয়ে নিজেকে একটা অর্থপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করেছেন। যিনি বিজয়ী হওয়ার কৃতিত্বের কথা জানেন। কিংবা যদি জয়ী হতে নাও পারেন, অন্ততপক্ষে বীরের মতো চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। অতএব, তার স্থান কখনোই সেসব ভীরু ও দুর্বল মানুষের সঙ্গে হবে না, যারা জয় কিংবা পরাজয় কোনোটার স্বাদ কখনো পায়নি।’
১০/০৪/২০২২, ০৯.০৫ PM
