অর্থনীতিবাংলাদেশ

স্বাধীনতা ও আমাদের জিডিপি

স্বাধীনতার ৫১ বছরে পদার্পণ করলো আমাদের সোনার বাংলাদেশ। যে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। তাই শুরু করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাষনের অংশ দিয়ে। ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতির পিতা বলেছিলেন, “আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে — এক নম্বর কাজ হবে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। …এমন আন্দোলন করতে হবে, যে ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান দেয়, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। …আপনারা সংঘবদ্ধ হন।”

বঙ্গবন্ধু তার সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন আজ ৪৫ বছর পরেও সে সব সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে তার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারকেও।

আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়ে ২৫৫৪ ডলার থেকে ২৫৯১ ডলার হয়েছে সত্য কিন্তু তার সিংহভাগ কয়েক হাজার কোটিপতিদের ব্যাংকের অক্ষর বাড়াচ্ছে। সেই সব কোটিপতিদের মাঝে বিদেশে সেকেন্ডহোম বানানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

এদিকে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, সামনের বছর জিডিপি নাকি আরো বাড়ার সম্ভাবনা আছে। তাহলে দেশের বাইরে হয়তো আরো সেকেন্ডহোম বাড়বে। আরো কিছু কোটিপতি, হাজার কোটিপতিদের দলে প্রবেশ করবে।

এখন প্রশ্ন হলো, জিডিপি বাড়লেই কি আসলেই আমাদের দেশের উন্নয়ন হয়? জিডিপি জিনিসটা কি এবং এটা কিভাবে কাজ করে তা আরেকটু ভালোভাবে বুঝতে হলে আকবর আলি খান এর “আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি” বইয়ের “সুখ স্থান” নামক গল্পটি বলা যেতে পারে,

সুখস্থান রাজ্যে ১০০ জন সুদর্শন যুবক বাস করেন। তাঁদের প্রত্যেকের আয় বছরে এক কোটি টাকা। তাঁদের প্রত্যেকের বাড়িতে একজন করে গৃহকর্মী আছেন। বছরে তাঁদের বেতন এক লাখ টাকা করে। এ দেশে মোট জাতীয় উৎপাদন ১০১ কোটি টাকা আর মাথাপিছু আয় ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। একদিন এই ১০০ যুবকই তাঁদের নিজ নিজ গৃহকর্মীকে বিয়ে করে ফেললেন।

স্ত্রীরা এখন খুশি হয়ে নিজের সংসারে তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেন, স্বামীরা আগের চেয়ে বেশি সুখে থাকেন। সবার সুখ বেড়ে গেছে। অথচ রাজ্যের সংখ্যাতত্ত্ববিদেরা বলছেন, রাজ্যে বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৫০ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫০ লাখে নেমে গেছে।

কারণ, বিয়ের আগে গৃহকর্মীরা বেতন পেতেন। স্ত্রী হওয়ার পর তাঁরা একই কাজ করেও বেতন পান না। স্ত্রীকে স্বামীর দেওয়া অর্থ জাতীয় আয়ে অন্তর্ভুক্তও হয় না। কাজেই সুখস্থান রাজ্যে সবার সুখ বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও মোট জাতীয় উৎপাদন ও মাথাপিছু আয় কমে গেছে। এক বছর পর রাজ্যের ১০০ দম্পতি তাঁদের বিবাহবার্ষিকীতে নিজেদের নতুন গাড়িতে চড়ে বেড়াতে গেলেন।

ফেরার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় ১০ জন স্ত্রী মারা যান। ১০ জন স্বামী প্রত্যেকে একটি করে পায়ের আঙুল হারান। আরও ২০ জন হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে যান। এক বছর পর রাজ্যের সংখ্যাতত্ত্ববিদেরা জানালেন যে রাজ্যে মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে; কারণ, ১০ জন স্ত্রী মারা যাওয়ায় জনসংখ্যা কমেছে অথচ সব পুরুষ জীবিত থাকায় মোট জাতীয় উৎপাদন কমেনি; বরং বেড়েছে।

কেননা, হাসপাতালে মৃতদের সৎকারকারীদের এবং গাড়ি মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বেড়েছে। পরের বছর সেনাবাহিনী রাজ্যের ক্ষমতা দখল করে নিয়ে রাজ্যের সবাইকে অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদনে বাধ্য করল। এতে রাজ্যে মাথাপিছু আয় ২০ শতাংশ বেড়ে গেল। যদিও রপ্তানি আয়সহ রাজ্যের মোট উৎপাদনের ৫০ শতাংশ নতুন ক্ষমতাসীন প্রধান ও তাঁর ৯ জন স্যাঙাত আত্মসাৎ করেন।

এর ফলে রাজ্যের ৯০ শতাংশ আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। তার মানে, গড় আয়ের ভিত্তিতে মানুষের সুখ বেড়েছে। কিন্তু ৯০ শতাংশ লোকের মাথাপিছু আয় ও সুখ কমে গেছে। শুধু ১০ ভাগ লোকের আয় বেড়েছে।

এভাবে দেখা গেল, সুখস্থান রাজ্যে মানুষের সুখ যখন বাড়ছে, মাথাপিছু আয় তখন কমে যাচ্ছে; আর যখন দুঃখ বাড়ছে, তখন মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে। তবে দোষ সুখস্থানের নয়, সমস্যা হলো জাতীয় আয় হিসেবের পদ্ধতিতেই। আসল কথা হচ্ছে আপনি যে আয় কখনো চোখে দেখবেন না, আপনার সেই আয়ের হিসাব সরকারের কাছে আছে। আর যে ব্যয়ের হিসাব আপনি মুখস্থ বলে দিতে পারবেন, তার হালনাগাদ কোনো হিসাব সরকারের কাছে নেই।

তাহলে এখন আমাদের কি দরকার?

প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ভাই রবার্ট কেনেডির ১৯৬৮ সালের ১৮ মার্চ ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাসে দেওয়া এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘জিডিপি আমাদের শিশুদের স্বাস্থ্য, স্কুলের শিক্ষার মান কিংবা খেলার আনন্দকে গোনায় ধরে না। আবার জিডিপি আমাদের কবিতার সৌন্দর্য কিংবা বিয়ে ব্যবস্থার শক্তির দিক, বুদ্ধিদীপ্ত গণবিতর্ক কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মনিষ্ঠাকেও গোনায় ধরতে জানে না।

এমনকি আমাদের বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধ, সাহস, প্রজ্ঞা, শিখতে পারার ক্ষমতা, আমাদের আবেগ, আমাদের দেশভক্তি-কোনো কিছুকেই গোনায় ধরে না এই জিডিপি। আসলে জিডিপি সবকিছুই মাপে, কেবল যা যা আমাদের জীবনকে অর্থবহ করে তোলে, সেসব ছাড়া।’

স্বাধীনতার ৫১ বছরে আমার চাওয়া সরকার যেনো জিডিপি নিয়ে নয় বরং জিএনএইচ (গ্রোস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস) নিয়ে কাজ করে। তাহলেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে।

১৪/০৩/২০২২, ০৩.৩৫ PM

Mahbub Babu

আমার জন্ম সময়ের প্রয়োজনে। আমার জন্ম যুদ্ধের আয়োজনে। আমি মায়ের গর্ভেই শুনেছি যুদ্ধের ডামাডোল। আমি এসেছি ধ্বংসের বার্তা নিয়ে। সব প্রাচীর গুড়িয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে চলা আমি এক কালপুরুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *