ব্যক্তিগত

টোনাটুনি কিংবা উজির নাজির

আমি আবার বিতং না করে কিছুই বলতে পারিনা, তাই হাতে সময় নিয়ে পড়তে বসাই ভালো। আর তাছাড়া আমার বিশ্বাস, কেউ কেউ অন্য কারো জীবনে ঘটে যাওয়া টুকরো টুকরো ঘটনায় নিজেকে দেখা যায় কিনা সেটা জানতেও ব্লগ পড়তে আসে। তাহলে শুরু করি, আমার রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দা। কিন্তু আমার বারান্দায় বাসার মানুষদের আনাগোনা কম। নিতান্তই খুব প্রয়োজনে।

কারন, আমি একা থাকতে পছন্দ করি। শুধু একা হলেও কথা ছিলো। আমার পুরো বিষয়টাই ভিন্ন। আমি গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত-শীত ও বসন্ত সকল ঋতুতে দরজা-জানালা বন্ধ করে পর্দা দিয়ে ভালো করে ঢেকে রাখি। হঠাৎ একদিন চড়ুই পাখির কিচির মিচির শুনে পর্দা সরিয়ে দেখলাম গল্পের দুই চড়ুই অর্থাৎ টোনাটুনি ওদের ভাষায় খুব জরুরী বিষয়ে আলাপ করছে। আমি তেমন একটা পাত্তা দিলাম না।

একদিন-দুইদিন-তিনদিন করে সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম, আমার বারান্দার এক কোনে সেই দুই টোনাটুনি তাদের স্বপ্নের ঘর বুনছে। অর্থাৎ চড়ুই পাখির বাসা। আমি আগে কখনো এতো কাছ থেকে পাখির বাসা বুনতে দেখি নাই। খুব শিহরিত ও রোমাঞ্চিত হলাম এই ভেবে, আমি নিজে একাকি জীবন কাটালেও নিঃসঙ্গ এই আমাকে সঙ্গ দিতে দুই নব দম্পতি বাসা বাঁধছে আমারই বারান্দায়।

আপনারা নিশ্চই বিরক্ত হচ্ছেন এই ভেবে যে, আমি দুটি চড়ুইয়ের ঘর বাঁধার ঘটনা এতো ইতং – বিতং করে কেনো বলছি? এখন সেই ঘটনাটাই বলবো আপনাদের। আগেই বলেছিলাম, আমি খুব কাছ থেকে ওদের ঘর বানানো দেখতাম লুকিয়ে লুকিয়ে।

একবার বারান্দায় তোয়ালে আনতে গিয়ে আমি ওদের সামনে পরে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ওরা খুব অবাক করে দিয়ে ওরা ওদের কাজ করে যেতে লাগলো। সাধারনত চড়ুই পাখি খুব সামান্য থেকে সামান্যতম বিষয়ে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু ওরা দু’জন ছিলো এর ব্যতিক্রম। এমনি করে পেরিয়ে গেলো বেশ কিছু দিন।

একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমি আর চড়ুই পাখির ডাক শুনিনা। পর্দা সরিয়ে দেখলাম, বারান্দায় কেউ নেই। একদিন-দুইদিন-তিনদিন করে কেটে গেলো সপ্তাহ, সপ্তাহ ঘুরে গেলো মাস। কিন্তু টোনাটুনির নিজ ঠোঁটে, খুব যত্নে গড়া বাসা শূন্যই পরে রইলো।

হয়তো ওদের ভিতর মান অভিমান চলছে, হয়তো ওদের ভিতর বিচ্ছেদ হয়েছে আর তাই ওরা চলে গেছে যে যার পথে। আচ্ছা পাখিরাও কি মানুষের মতো অভিমানী হয়, ওদেরও কি ঝগড়া হয়, হয় বিচ্ছেদ?

তবে একটা চড়ুই কিন্তু আজো চুপিসারে এসে দেখে যায় তার সঙ্গীনিকে নিয়ে বানানো ঘর খানা আজো সুরক্ষিত আছে কিনা। একদিন সন্তর্পনে আসা সেই একলা চড়ুই আমার ক্যমেরায় ধরা পরে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললাম,

– “হায়রে চড়ুই, তুইও আজ একা। যাবার বেলায় তোর সঙ্গিনী কি বলে গিয়েছিলো কি তোর অপরাধ, নাকি তুইও কৃষ্ণ গহ্বরে ঘুরপাক খাচ্ছিস আমারই মতন?”

মহাদেব সাহা রচিত আমার খুব প্রিয় একটি কবিতা দিয়ে এই লেখাটি শেষ করবো –

“এই বুকে ভূমিকম্প সয়, বিচ্ছেদ সহে না,
অগ্নিকান্ড সয়, অশ্রুজল সহে না, সহে না;
এই বুকে সবই সয়, শুধু সহে না বিরহ
সহে না কেবল এইভাবে ঘুরিয়ে নেয়া মুখ,
এই বুকে কতকিছু সয়, দুঃখ-পরাজয়
কতো ঝড়জল সয় বুকে, উপেক্ষা সহে না;
এই বুকে সয় কতো মেঘরৌদ্র, অন্তহীন খরা
শুধু তোমার আঘাত বুকে সহে না, সহে না।
সয় কাঁটা, শুধু সয় না তোমার ভুকে যাওয়া
এই বুকে জলোচ্ছাস সয়, ক্রন্দন সহে না,
এই বুকে কতো কিছু সয়, দূরত্ব সহে না;
এই বুকে সবই সয়, শুধু বিচ্ছেদ সহে না
মরুঝড় সয় বুকে, তোমার অশ্রু সহে না।

২৫/০৩/২০২২, ১১.৪৫ PM

Shamim Rony

পেশায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। খুব কাঠখোট্টা বিষয় নিয়ে বসবাস। চেষ্টা করি সমস্যার গভীরে যেয়ে ডুবুরীর মুক্তা আরোহনের মতোই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করে আনতে। জানার আগ্রহ প্রবল। এখনো নিজেকে এই বিশ্ব ভ্রম্মান্ডের ছাত্র বলেই মনে করি। টেকনোলজি ভালোবাসি, সেই সাথে ভ্রমন পিপাসুও বটে। টেক দুনিয়ার হাল-চাল, বিদেশী অনুবাদ ও বিদেশ ভ্রমনের অভিজ্ঞতার রসদ সম্বল করেই কলম ধরেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *