না প্রেমিক, না বিপ্লবী
ছেলেবেলায় সাধ ছিলো গান শেখার। কত কিছুই যে ইচ্ছে হতো তখন। মনে আছে, সুনসান দুপুর বেলা চিলে কোঠায় বসে ভাবতাম – ইস্, যদি চিল হওয়া যেত। তবে ওই উঁচুতে বিলি কাটতাম আকাশের বুকে। “ত্রী রত্নের নৌবিহার” পড়ে তো ঠিক করে ফেলেছিলাম সব ছেড়েছুঁড়ে চলে যাবো টেমস্ নদীর দেশ ইংল্যান্ডে। মহাদেশটা কি যে ভীষন টানতো আমার কৈশোরের রক্ত। বলে বোঝানো যাবে না। নির্জন মাটিতে কান পেতে কত দিন শুনতে চেয়েছি নদীর অজস্র ঢেউ ভাঙ্গার গান। তখন নদীর বুকে বৃষ্টি নামলেই কিভাবে যেন টের পেয়ে যেতাম ইলিশের ঝাঁক ছুটছে পদ্মার ঘোলা জলে। মনে হতো, আমি যেনো তুমুল বৃষ্টিতে ভেজা কিশোর এক, ডিঙ্গি ভাসিয়েছি থৈহীন জলস্রোতে। বেদনার বালুচরে নিঃশব্দে পা ফেলে ফেলে কোন ফাঁকে সময় চলে যায়। আজ আমার বুকের গহীনে গচ্ছিত রাখা সেই অচিন রৌদ্দুর, ভুবন চিলের ডাক, নদীর ঢেউ ভাঙ্গার গান, রূপালী ইলিশের ঝাঁক – এদের খবর নেয়ার ফুসরত জোটে কই।
কলেজ রাজনীতির ঘূর্নিপাকে পড়ে একদা এই মধ্যবিত্ত রক্তে জাগালো ষ্পর্ধিত বিপ্লবের শপথ। আমি শেকল ভাঙ্গার গান গাইলাম। স্বপ্ন দেখলাম সকল ছাত্র ছাত্রীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের। নষ্ট জ্যোৎস্নায় অভিলাষী মন খুঁজল চন্দ্রালোক। এই ভেবে বহু দিন, মাস, বছর চলে গেল। আমি পরাজিত হলাম। শাস্তি স্বরূপ বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে পারলাম না। দুই বৎসরের সঞ্চিত শিক্ষা জলে গেল। মাথা নুয়াইনি ওদের কাছে। ফিরিনি মানুষ বানানোর কারখানাকে পুঁজি করে বেঁচে থাকা ঐ কুৎসিত জানোয়ার গুলোর কাছে।
ব্যার্থতা, হতাশা আর স্বপ্ন ভঙ্গের অভিশাপ বুকে নিয়ে বয়ে গেল কিছু সময়। হঠাৎ দেখা হলো পার্থিব জগতে বিচরন করা এক মানুষের সাথে। তারপর, কোন এক তৃষিত তিমিরে হঠাৎ আশ্চার্য জাদুর বাস্তবতায় বেজে উঠলো হৃদয়ের সব কটি তার। ভালোবাসায় দ্রবিভূত অন্তর শুনলো রিচার্ড ম্যাক্সের পাগল করা গান। ভাবলাম, মানুষ চাঁদে গেল, আর আমি ভালোবাসার অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু যখন জানলাম সে আজ দূরাশ্রিত কোন গ্রহালোকের বাসিন্দা তখন আর তার কাছে ফিরে যাইনি রক্তিম সদৃশ গোলাপ হাতে। সেসব শুধু স্বপ্ন দেখার গল্পই থেকে গেলো শেষ পর্যন্ত। আমার কিছুই হওয়া হয়নি। না প্রেমিক, না বিপ্লবী। প্যানডোরার বাক্সে আটকে পরা আশার মতো আমার স্বপ্নেরা রয়ে গেল তুঁত পোকা হয়ে কোকুনের ভেতর। পাখা মেলা হলো না আমার সেসব আশ্চার্য সুন্দর বন্য স্বপ্নগুলোর। আমি আমি’ই রয়ে গেলাম। আমার কিছুই হওয়া হয়নি।
২৪/০৭/২০২২, ১০.০০ AM
