গল্পটা তোমার আমার (পর্ব- ১)
এক
শামীম ভ্রু কুঁচকে হাতের চিঠিটার দিকে তাকিয়ে আছে। সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে লিখা একটা প্রেমপত্র! আবেগে ঠাসা অল্প কিছু কথা। চিঠিটা সে আবার পড়ল –
প্রিয়তমেষু,
একরাশ কৃষ্ণচূড়ার শুভেচ্ছা জানবেন। জীবনে প্রথমবার প্রেমে পরেছি। যাকে বলে প্রথম দেখায় হুড়মুড়িয়ে প্রেমে পরা! যেন এক পশলা বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে যাওয়া। এমনটা শুধু গল্পেই পড়েছিলাম। নিজের জীবনে এমন দিন দেখতে হবে ভাবিনি কখনো। সেই থেকে শুরু হয়েছে আমার আপনাকে ঘিরে “তুমিময় জীবন”। আমার প্রতিটি দিন এখন শুরু থেকে শেষ অব্দি আপনাকে চর্চা করে কাটে। খুব শীঘ্রই আপনাকে আমি “আমিময়” করে ফেলব। প্রেমে পরবার যন্ত্রণা আপনি আমায় দিয়ে ফেলেছেন তাই এর উত্তাপ তো আপনায় পেতেই হবে। ছেড়ে দেবার পাত্রী আমি নই।
আমি জানি এই মুহূর্তে আপনার ভ্রু জোড়া কুঁচকে আছে। আমার পরিচয় সময় এলেই জানবেন। একটু তো অপেক্ষা করতেই হবে জনাব। কারণ আমি আপনার মধুর সমাপ্তি হতে চাই।
অপরিচিতা
নাহ চিঠি পড়ে লেখকের পরিচয় উদঘাটন করা যাচ্ছে না। অফিসের ঠিকানায় এসেছে তার মানে যে পাঠিয়েছে সে আমাকে ভালো করেই চেনে। যা হোক সে কাজে মন দিল। কিন্তু চিঠিটার কারণে কিছুতেই কাজে মন বসছিল না।
শামীম আহমেদ একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে সিনিয়র ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে চাকরি করছে। মা শিরিন সুলতানা আর একমাত্র ছোট ভাই শুভকে নিয়ে তার ছোট্ট সাজানো জগত। তার এই বয়ে চলা শান্ত জগতে কেউ একজন ঝড় তুলে দিতে চাইছে আর এই চিঠিটা তারই সূত্রপাত।
দুই
রাতে বাড়ি ফিরে শামীম ফ্রেস হয়ে খাবারের টেবিলে বসল। শুভ কানে হেডফোন নিয়েই চেয়ারে বসতে নিলে শামীম তার মাথায় চাটি মেরে বলল,
– কিরে কানের মধ্যে সারাক্ষণ এই এক জিনিস, কান তো ফাটিয়ে ফেলবি একদিন। পড়াশোনা কিছু করিস নাকি বিক্রয় ডট কমে সব বেচে দিয়েছিস?
শুভ বলে,
– সম্ভব হলে তাই করতাম ভাইয়া। কিন্তু তোমার ব্যাপারটা কী আজাকাল অফিস থেকে দেড়ি করে বাড়ি ফিরছ? অফিসে সুন্দরী কোন কলিগ নতুন জয়েন করেছে নাকি?
শিরিন সুলতানা এসে বললেন,
– তেমন হলে বল আমাদের তো সমস্যা নেই শুধু মেয়ে ভালো হলেই হল।
শামীম বলল,
– মা তুমিও শুরু হয়ে গেলে এই গাধাটার সাথে?
শিরিন সুলতানা বললেন,
– ওমা! ভুল কী বললাম? আর কত এভাবে মেয়েদের বুকে যন্ত্রণা বাড়িয়ে ঘুরে বেড়াবি? বিয়ে করে আমাদের উদ্ধার কর। এই দুই পাজিকে আমি আর একা সামলাতে পারব না। আমার বয়স হয়েছে, তা বুঝবি কবে?
শামীম বলল,
– মা তুমি তো দেখছি বউ এনে আমার জীবনটা তেজপাতা না করে ছাড়বে না! শান্তি মত খেতে দাও ওসব পরে দেখা যাবে।
শুভ তখন বলল,
– বুঝলে না মা, ভাইয়ার ষাঁড়ের মতন একা দাঁপিয়ে বেড়ানো জীবনটা নষ্ট করতে চায় না। তুমি বরং আমায় বিয়ে দিয়ে দাও, ছোট্ট একটা বউ আসুক তারপর দুইজন মিলে সারাদিন গ্রুপ স্টাডি করব। একা আর হচ্ছে না কিছু।
শামীম বলল,
– মা তোমার গুণধর পুত্রের কথা শুনেছ? তাহলে আর দেরি কেন? পাত্রী দেখা শুরু করো।
শামীম উচ্চ মাধ্যমিকে থাকা অবস্থায় তার বাবা মারা যায়। একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে শিরিন সুলতানা তার দুই ছেলেকে একা হাতে কষ্ট করেই মানুষ করেন। শামীমের চাকরি হবার পর মা’কে আর চাকরি করতে দেয়নি। শিরিন সুলতানার দুই ছেলেই মা পাগল। ছেলেদের সাথে তার সম্পর্কটা একেবারেই বন্ধুর মতন।
নিচের গল্প গুলো পড়ে দেখতে পারেন –
তিন
পরদিন সকালবেলা অফিসে মিটিং থাকায় শামীম সকাল সকাল কোন রকম নাকেমুখে কিছু দিয়ে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় এক মেয়ের সাথে তার ধাক্কা লেগে গেল। কেন যেন ওর মনে হল ধাক্কাটা ইচ্ছাকৃত! কিছু বলবার জন্য মেয়েটার দিকে তাকাতেই তার বুকে ব্যথা করে ওঠে। এ যেন সদ্য ফোটা সুবাসিত এক দোলনচাঁপা! মেয়েটা তখন ধমকে উঠতেই শামীম ভাবনা থেকে বাস্তবে এলো। মেয়েটা চোখ পাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
– মেয়ে দেখলেই ধাক্কা দিতে ইচ্ছে হয়, না?
শামীম বলল,
– দেখুন আপনি ভুল বুঝছেন আমি ইচ্ছে করে ধাক্কা দেইনি তাড়াহুড়োয় হয়ত লেগে গিয়েছে, সরি।
মেয়েটা চোখ বড় করে বলল,
– ধাক্কা দিয়ে আবার মিথ্যে বলা হচ্ছে! আর আপনার সরি দিয়ে আমি কী করব?
শামীম তখন রেগে গিয়ে বলল,
– ও হ্যালো, ধাক্কাটা তো মনে হল আপনিই ইচ্ছে করে দিলেন আর এখন এত কথা শোনাচ্ছেন! সরি বললাম শুনতে পান না?
মেয়েটা তখন এগিয়ে এসে শামীমের পায়ে সজোরে একটা পারা মেরে দিল! শামীম ব্যথায় “আহ…” করে উঠে বলল,
– এটা কী হলো?
– হিসাব বরাবর হলো। বলে মেয়েটা চলে গেল।
শামীমের মেজাজ বিগড়ে গেল, তাড়া না থাকলে একে কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দেয়া যেত, প্রয়োজনে পায়ে ডাবল পারা মেরে!
অফিসে গিয়ে মিটিং শেষ করে শামীম তার কেবিনে বসতেই দেখে টেবিলে একটা খাম। খুলতেই দেখে সেই মেয়েটির দেয়া চিঠি। সে পড়তে লাগল –
মি. শামীম,
কী ভাবছেন? এত ভাবাভাবির কিছু নেই। আমার মনে তো ঝড় তুলে দিয়েছেন তার তান্ডব এখন রোজ দেখতে পাবেন। অফিসে তো শুধু আমার অস্তিত্বের জানান দিয়েছি এরপর খুব শীঘ্রই আপনার বেডরুমে হাজির হচ্ছি। তারপর স্থায়ী হওয়াটা শুধু সময় মাত্র।
ও ভালো কথা আপনি তো এখন অব্দি আমার নামটাই উদ্ধার করতে পারেননি! পারবেন সে সম্ভাবনাও নেই আজ মুড ভালো তাই একটু সদয় হচ্ছি…
চাঁপা
চিঠিটা শামীমের বিগড়ানো মেজাজ আরও একটু বিগড়ে দিল। কে এই চাঁপা? যে লুকিয়ে থেকে চাপাবাজি করে যাচ্ছে? আর এত হেয়ালীই বা কিসের? শামীম মনে মনে বলল,
“ঠিক আছে আমিও দেখতে চাই
কী করে আমার বেডরুমে তুমি
স্থায়ীভাবে হও দাখিল,
কারণ তোমার জন্য আমি
সাজিয়ে রাখব
এক্সিট বাটন, ফাজিল।”
রাতে বাড়ি ফেরার পর শিরিন সুলতানা ছেলের চেহারা দেখে বুঝলেন শামীম ভাবনায় আছে কিছু একটা নিয়ে। তিনি মুচকি হেসে বললেন,
– কিরে অফিসে কিছু হয়েছে নাকি কোন মেয়ে ঘটিত ব্যাপার?
শামীম হেসে বলল,
– আচ্ছা মা তোমার সব কথাই “মেয়ে” শব্দটাতে গিয়ে শেষ না হলে চলে না, না?
শিরিন সুলতানা হেসে বললেন,
– না আগে কখনো এমন ভাবতে দেখিনি তো তাই…।
শামীম বলল,
– মা মেয়ে ঘটিত কোন ব্যাপার হলে সে সবার আগে তুমিই জানবে।
মায়ের সাথে রোজ রাতে কিছুক্ষণ গল্প করে তারপর শামীম ঘুমাতে যায়। আজও তাই হল।
এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-২)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব- ৩)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব- ৪)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-৫)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-৬)
- গল্পটা তোমার আমার (শেষ পর্ব)
চার
আজ শুক্রবার ছুটির দিন, ছুটির দিনে এমনিতেই ছেলেরা বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। শিরিন সুলতানা নিজের চা নিয়ে কাজের সাহায্যকারী মেয়ে পরীকে বলল শামীমকে চা দিয়ে আসতে। মেয়েটা চা নিয়ে শামীমের ঘরে গিয়ে দেখে সে ঘুমাচ্ছে। তার এলোমেলো চুলগুলো কপালের উপর এসে পড়েছে… গোলাপি ঠোঁটজোড়া খোলা… হলদে রঙা টিশার্টে একেবারে শিশুর মত লাগছিল… পরীর ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল তাকে একটু ছুঁয়ে দিতে। ও শামীমের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আস্তে করে হাত বাড়াতেই শামীম নড়ে ওঠে! পরী তখন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি নিজের ফর্মে এসে যায়। তারপর মুচকি হাসি দিয়ে চিৎকার করে ডাকে,
– জান উঠেন আপনের চা
শামীম প্রায় লাফিয়ে উঠে যায়। তাকিয়ে দেখে তার শিয়রে এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পরনে ময়লা জামা, তেল জবজবে চুলে দুই বেণি করে ফিতা দিয়ে বাঁধা। মেয়েটির গায়ের রঙ অদ্ভুত রকমের কালো আর চোখের দিকে তাকাতেই কেমন চেনা মনে হল! মেয়েটিকে দেখে প্রথমে অবাক লাগল তারপর রেগে জিজ্ঞেস করে,
– কে আপনি? আর এভাবে চেচাচ্ছেন কেন?
তখন পরী বলে,
– আমি ফুলের খালা। ফুলের মায়ের জ্বর, হেয় আজকে আইব না তাই আমি আসছি। এহন চা নেন। ঠান্ডা হইয়া গেলে আবার বানায় দিতে পারব না, আমার অনেক কাজ আছে। আমি আবার কথা কম কাজ বেশি করি বুঝছেন।
শামীম রাগে দাঁত কিড়মিড়ি করে বলে,
– তুমি কি আস্তে কথা বলতে পারো না?
পরী গলার আওয়াজ আরো দুই ধাপ ওপরে তুলে বলল,
– আমি আস্তেই বলি আপনার কানে সমস্যা হইলে আমি কি করুম? আপনে কানে তুলা দেন। আমার মেলা কাম আছে আপনের সাতে এত কথা কইলে হইব না। আর আমি বিড়াল না যে মিউ মিউ করব। আমার গলা বাঘের মতন তাই আমি গর্জন করেই কথা বলি।
শামীমের মনে হল কানের কাছে কেউ চড়া ভলিউমে টেপ রেকোর্ডার ছেড়ে দিয়েছে, কেউ এত জোরে এবং একই সাথে এতো কথা কীভাবে বলে? সে এক ধমক দিয়ে রুম থেকে পরীকে চলে যেতে বলল।
– “যাইতাছি” বলে গজগজ করে কি যেন বলতে বলতে পরী চলে যায়।
আর মনে মনে হাসে এটা ভেবে যে সে যে ভাইজানের ভাই কেটে দিয়ে শুধু “জান” ডেকেছে শামীম সেটা শুনতে পায়নি! পরীর স্বভাবই এমন দুষ্টুমি না করলে তার পেটের ভাত হজম হয় না। যাকে বলে একেবারে দস্যি মেয়ে!
নাশতা সেরে শামীম তার ঘরে গিয়ে ল্যাপটপ অন করে বসেছে। অফিসের কিছু কাজ ছিল সেরে নিতে চায়। আর অমনি পরী এসে বলল,
– জান এহন এই কোম্পিলিটার নিয়ে বসলেন যে? বাজারে যাইবেন কখন? আর আপনের সব আধোয়া কাপড়গুলা কে দিব ধুইতে? আমার আর কাজ নাই নাকি? তাড়াতাড়ি উঠেন কইতাছি।
শামীম ভ্রু কুঁচকে বলল,
– এই তুমি আমাকে কি বললে? কি বলে ডাকলে?
পরী তখন উল্টো ঘুরে জ্বিভে কামড় দিয়ে মনে মনে ভাবল এই রে এ তো শুনে ফেলেছে! মুখে বলল,
– কি কইছি? ভাইজান কইছি। আপনের আম্মাই তো বলছে ভাইজান বলতে নাইলে আমি তো আপনারে খালু ডাকতে চাইছিলাম।
শামীম রেগে গিয়ে বলল,
– তুমি মোটেও আমাকে ভাইজান বলোনি, আর খালু ডাকতাম মানে? আমাকে দেখতে কি খালু লাগে?
পরী বলল,
– দেখেন আমি আপনেরে যা ডাকনের তাই ডাকছি এখন আপনে হারাদিন মাইয়াগো কাছ থিকা কি হুনেন তা কি আমি জানি?
শামীম বলল,
– তুমি এক্ষুনি আমার ঘর থেকে বের হও।
পরী ঘর থেকে বের হয়ে রান্নাঘরে দিকে চলে গেল আর তার মিষ্টি মুখটায় দুষ্টু হাসি খেলে গেল। তার মিশন সাক্সেস! এখন শুধু তরতর করে তার এগিয়ে যাবার পালা।
[চলবে]
২৭/০৩/২০২২, ১২.৪৫ PM
