দর্পণ ভয়ংকর (পর্ব – ১)
১)
রাফি সম্প্রতি অদ্ভুত একটা সমস্যায় পরেছে। আসলে এটা সমস্যা নাকি শুধুই তার মনের কল্পনা সেটাও সে বুঝতে পারছে না। সমস্যাটা এমন যে লোকে জানলে তাকে পাগল ভাববে, তাই কারো সাথে ব্যাপারটা শেয়ারও করতে পারছে না। বেশ কিছুদিন ধরেই সে তার ঘরে কোনো কিছুর শীতল উপস্থিতি টের পাচ্ছে। অশরীরী টাইপ। যার সাথে রাফির কথাও হচ্ছে! আচ্ছা আয়না কখনো কথা বলতে পারে? আয়নার সামনে দাঁড়ালে কখনো অন্য কাউকে দেখা যায়? রাফির আতংক লাগে।
২)
রাফসান খান রাফি। বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে। রাফির ৫ বছর বয়সে তার মা মারা যায়। ছেলের অযত্ন হবার ভয়ে বাবা রাশেদ খান আর বিয়ে করেননি। তাই রাফির একরকম একাকী নিঃসঙ্গ জীবন কেটেছে। তাকে দেখাশোনা করার জন্য আলাদা কাজের লোক থাকলেও রাফি তাদের থেকে নিজেকে আলাদা একা রাখতে পছন্দ করত। কিন্তু নিঃসঙ্গতারও সঙ্গ লাগে তাই সে নিঃসঙ্গতা দূর করার এক অভিনব কায়দা বের করে নিয়েছে, আয়নার সঙ্গে কথা বলা। আয়নার সাথে কথা বলাটা তার অতি প্রিয় খেলা। এই খেলা খেলতে খেলতেই তার বেড়ে ওঠা।
রাফির বাবা ব্যবসায়ী মানুষ। গত মাসে বিজনেসের কারণে ইন্ডিয়া গিয়েছিল। ফেরার সময় সেখান থেকে ছেলের জন্য বিশাল বড় এক আয়না নিয়ে এসেছে। রাফির শোবার ঘরে বিছানার পাশে ওটা সেট করা হয়েছে। আয়নাটা কাঠের কারুকার্যময় ফ্রেমের ৫ ফিট লম্বা। সামনে দাঁড়ালে পা থেকে মাথা অব্দি দেখা যায়। এই আয়নাটার সামনে দাঁড়ালেই রাফির কেমন যেন অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। ওর কেবলই মনে হয় কেউ যেন ওকে দেখছে! দিন তিনেক আগে সে যখন রাতে আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিনের মতই বলে,
– “হ্যালো রাফি!”
আয়না থেকে সাথে সাথে জবাব আসে,
– “হ্যালো…।”
রাফি প্রথমে ভুল শুনেছে ভাবে। তারপর সে ভুলটাকে পাত্তা না দিয়ে বলতে থাকে,
– তো, আজও কিছু করতে পারলে না? এবারের জলটা বেশি ঘোলা হয়ে গেছে। তোমাকে অন্যরকম কিছু ভাবতে হবে, বুঝলে?
আয়নাটা তখন বলল,
– “তুমি চাইলে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি?”
এবার রাফি আশ্চর্য হয়, সেই সাথে খানিকটা ভয়ও পেয়ে যায়। সে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আশ-পাশটা ভালো করে তাকিয়ে দেখে, কোথাও থেকে কেউ কথা বলছে কি না? কিন্তু ঘরে তো সে ছাড়া দ্বিতীয় কেউ নেই। সে চিন্তিত মুখে আয়নার সামনে থেকে সরে যায়। কিন্তু পরদিন রাতেও যখন ও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে তখন আয়নাটা আবার কথা বলে ওঠে! রাফি অবাক হয়। কথাগুলো কোথা থেকে আসছে? তার ঘরে তো কেউ নেই। সত্যিই কি আয়নাটা কথা বলছে। কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব? সে ভাবল তার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে বেশ স্ট্রেস যাচ্ছে সে কারণে হয়ত তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। আর তখনই তার ফোন বেজে ওঠে। মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে “কিলার” নামটা জ্বলজ্বল করছে। সে ফোন রিসিভ করে হ্যালো বলল কিন্তু ওপর প্রান্তে কোন কথা নেই। রাফি বার তিনেক হ্যালো বলে বলল,
– কি ব্যাপার কথা বলছ না কেন? বলবে তো কিছু?
ওপাশ থেকে যথারীতি নীরবতা। রাফি তখন বলল,
– কথা বলবে না? কতবার ফোন আর টেক্সট করেছি জানো? তোমার যেমন আমাকে শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে তেমন ইচ্ছেটা তো আমারও হতে পারে?
এই লেখিকার অন্যান্য লেখা –
রাফি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
– আচ্ছা একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। আয়না কি কথা বলতে পারে? আমার ঘরের নতুন আয়নাটা মে বি আমার সাথে কথা বলে। ওটা আসলেই কথা বলছে নাকি পুরোটাই আমার হ্যালুসিনেশন ঠিক বুঝতে পারছি না। তুমি কি এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারো?
ওপাশ থেকে ফোন কেটে দিল। রাফি ভাবল কি করা যায়? রাত বেশি হয়নি সাড়ে ১০টা বাজে। একটা চান্স কি নেয়া যায়? অবশ্যই নেয়া যায়। সে বের হবার প্রস্তুতি নিল। রাফিদের বাড়ি দেখাশোনা করার জন্য একজন বয়স্ক চাচা আছেন, যিনি ১৯ বছর ধরে এ বাড়িতে কাজ করছেন খুবই বিশ্বস্ত লোক। রাফিকে সেই এক রকম আগলে রেখে বড় করেছে। রাফি বের হবার সময় তাকে জিজ্ঞাস করলো,
– “বাবা কোথায়?”
সে বলল,
– বড় সাহেব তো বাড়ি ফেরেনি এখনো, তার রাত হবে বলে দিছে।
– চাচা আমি একটু বাইরে যাব বাবাকে বলে দিও আজ রাতে নাও ফিরতে পারি। সে যেন কোন চিন্তা না করে। প্রয়োজনে আমি তাকে ফোন করে নেব।
বলে সে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেল। গ্যারেজ থেকে তার অডি S8 গাড়িটা বের করে নিজেই ড্রাইভ করে রওয়ানা হয়ে গেল। গাড়িতে বসে দ্রুত ভেবে নিল কি করা যায়? তারপর বন্ধু রাইয়ানকে ফোন দেয়। এই রাইয়ান এক আজব পাবলিক, তার কাছে সমাধান নেই এমন কোন কাজ নেই। তাকে ফোন করলে সে ফোন রিসিভ করে বলে,
– হ্যাঁ বল
– তোকে এক্ষুনি একটু বের হতে হবে। কাজ আছে আমি আসছি তোকে নিতে। আর তুই তোর চারুকলার যে বন্ধুটা আছে না সাদিক? ওকে ফোন করে বল রেডি থাকতে ওকেও আমার লাগবে।
– এই রাতের বেলা কি করতে চাইছিস?
– আছে, আগে আয় তারপর বলছি।
এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –
বলে রাফি ফোন রেখে দেয়। রাফির বন্ধুরা রাফিকে ভীষণ পছন্দ করে এটা ওর ভালো স্বভাবের কারণে নাকি ওর বাবার টাকার কারণে সেটা ঠিক বোঝা যায় না। হয়ত দুটোই। তবে বন্ধু গুলো কাজের। সময়ে অসময়ে কাজে আসে। রাফি রাস্তায় একটা হার্ডওয়ারের দোকান থেকে কিছু জিনিস নিয়ে নেয়। সেখান থেকে বের হতে গিয়ে দেখে এক বুড়ি মহিলা কিছু কাঁচের চুড়ি নিয়ে বসে আছে। এই বয়সে এত রাতে এভাবে একে দেখে রাফির খুব মন কেমন করে ওঠে। ও তখন বুড়িকে গিয়ে বলে,
– চাচী, এত রাতেও বসে আছ? এত রাতে আর কে আসবে তোমার চুড়ি নিতে?
– বাবারে পেটের জন্য বসে থাকি। যদি আর দুই মুঠ চুড়ি বেশি বিক্রি হয় তাই।
– কয় মুঠ চুড়ি আছে গুনে দেখো তো? সব গুলার কত দাম হয় বলো?
বুড়ি চুড়ি গুনে বলল,
– ৪৫ মুঠ চুড়ি আছে বাজান। ৪০ টাকা মুঠ। দাম যে কত হয়, আমি তো এত হিসাব জানি না!
– আমিও এত হিসাব জানি না চাচী। তোমাকে তিনটা নোট দিলাম দেখো তোমার হয় নাকি? বলে সে এক হাজার টাকার তিনটা নোট ধরিয়ে দেয়।
বুড়ি দেখে অবাক হয়। বলে,
– বাজান এত ট্যাকা! এত ট্যাকা তো হয় নাই, তুমি একটু হিসাব কইরা দেখো না?
– পারব না চাচী। তুমি রেখে দাও।
বলেই সে আর দাঁড়িয়ে না থেকে গাড়িতে উঠে পড়ে। গাড়ি ঘুরাবার সময় দেখে বুড়ির চোখে পানি! যে পানিতে কষ্ট নয়, হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা আছে। বেঁচে থাকার জন্য ভালোবাসার চেয়ে বেশি আর কি লাগে? তাই হুটহাট এমন ভালোবাসা কেনার সুযোগ হলে তা ফিরিয়ে দিতে নেই বরং লুফে নিতে হয়। কারণ ভালোবাসা বিহীন বেড়ে ওঠা মানুষগুলোই জানে এর কত প্রয়োজন!
২০/০৭/২০২২, ১০.০০ AM
