গল্পছোট গল্প

একটা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের গল্প

আম্মা ঠিক করেছে এবার আমাকে বিয়ে করিয়েই ছাড়বে। এমন শক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলা যায় না। তার উপর প্রেম-পীরিতির ভাগ্যও কপালে ছিল না। তাই চুপচাপ চলে আসছি। কিন্তু বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে এসে কনফিউজড হয়ে গেছি। মিষ্টি দেয় নাই। নরম চানাচুরের সাথে কালো কাপে করে চা দিয়েছে। চানাচুর খেয়ে মজা না পাওয়ায় চায়ের দিকে হাত বাড়াতেই মেজো খালা ঝাড়ি দিলেন,

– “কালো কাপে চা খাবি না!”

মেজো খালা বিভিন্ন তান্ত্রিক বিষয়ের চলন্ত উইকিপিডিয়া। তার সাথে কথা বললে এ বিষয়ে অনেক জ্ঞান পাওয়া যায়। তাই জ্ঞান বাড়ানোর জন্য আমি জিজ্ঞাসা করলাম,

– “কালো কাপে চা খেলে কি হয়?”

খালা উত্তর দেওয়ার আগেই মা চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকালেন। মায়ের চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে মিষ্টি না দেওয়ায় আম্মা হতাশ। আম্মার হতাশ হওয়ার অবশ্য কারণ আছে। ডায়াবেটিসের লক্ষণ প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে বাসায় উনার মিষ্টি খাওয়ার উপর কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে। আর উনার আগ্রহ বেড়ে গেছে। আমাকে বিয়ে করানোর চেয়ে উনার মিষ্টি খাওয়ার আগ্রহ কোন অংশে কম নয়।

মিষ্টির হতাশা কমানোর জন্য চোখ রাঙিয়ে মা আমার হতাশা বাড়িয়ে দিল। আমি হতাশা কাটাতে কালো কাপ থেকে গ্লাসে চা ঢেলে নিলাম। আমাদের সামনে মেয়ের চাচাতো ভাই বসে আছে। গ্লাসে চা ঢালতে দেখে তার সরু চোখগুলো আরো সরু হয়ে গেলো। আমি তার দিকে না তাকিয়ে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে টিভির দিকে তাকালাম। সনি ব্রাভিয়ার টিভিটা সুন্দর আছে। এই সুন্দর টিভির সাথে নরম চানাচুর মানাচ্ছে না। কথাটা ছোট করে মেজ খালাকে বলতেই উনার চিন্তাভাবনা এলোমেলো হয়ে পান চিবুনো বন্ধ হয়ে গেলো। মেজো খালার মাথায় কিছু ঢুকলে সহজে বের হয় না। তিনি পানের পিক ফেলার নামে ভিতরে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। মেয়ের চাচাতো ভাইকে বলতেই সে খালাকে ভিতরের দিকে নিয়ে গেল। আমি চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে ভাবতে লাগলাম রেস্টুরেন্টে বসলে ভালো হতো। ন্যাতানো চানাচুরের বদলে অন্যকিছু খাওয়া যেতো। কি খাওয়া যেতো সেটা ঠিক করার আগেই মেজো খালা চলে আসলেন। তার মুখ হাসিহাসি। হাসির কারণ আর কিছুই না। খালার পিছনে মেয়ে আসছে। মেয়েকে দেখে বুঝলাম শুরুতে মিষ্টি দেওয়া হয়নি কেন। নাহ, মেয়ে চিনির মত মিষ্টি-সে কারণে নয়। মেয়ের হাতে মিষ্টির প্লেট। মেয়েকে দিয়ে মিষ্টি পাঠাবে বলেই শুরুতে মিষ্টি দেয়নি।

কিন্তু এই মেয়েকে দেখার পর মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয়ে যাবে। মেয়ের পরিবার আগে মিষ্টি না পাঠিয়ে মেয়ের হাতে পাঠিয়েছে। মেয়ের পরিবারের ইকোনমিকসের জ্ঞান ভালো। আমি ডায়াবেটিসের হাত থেকে বাঁচতে মাথা নিচু করে ন্যাতানো চানাচুর খেতে শুরু করলাম। আম্মা আর খালা মেয়ের সাথে কথা বলছে। মেয়ের পরিবর্তে মেয়ের মা জবাব দিচ্ছে। আমার ধারণায় ভুল নেই। মেয়ে ইকোনমিকসে পড়ে। এ কারণেই সে মিষ্টির প্লেট হাতে এসেছিল। ল অব ডিমিনিশিং মার্জিনাল ইউটিলিটির পরিবর্তে সাডেন ডিক্রিমেন্ট অব ইউটিলিটির জন্য আমি এই মেয়েকে নোবেল দিতাম। আপাতত নোবেল পকেটে নেই। মেয়েটার সাথে তাই কথা বলতে পারাটাই যথেষ্ট সাহসের কাজ। মেয়ের মায়ের বোধহয় আমার সাহসের পরীক্ষা নেওয়ার শখ হল। তিনি আম্মা আর খালাকে ঘর দেখাতে ভিতরে নিয়ে গেলেন। আমি মেয়েটার সামনে বসে ন্যাতানো চানাচুরের দিকে চেয়ে রইলাম। এই প্রথম চানাচুরগুলোর জন্য আমার মায়া হল। মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

– “আপনার হঠাৎ বিয়ে করার শখ হলো কেন?”

ইন্টার পরীক্ষায় কেমিস্ট্রির ভাইবার সময় গলার মধ্যে কথা সব দলা পাকিয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন পর আবার সেই অনুভূতি হল। মিনমিন করে বললাম,

– “শখ না, প্রয়োজন। বড্ড একা ফিল হচ্ছিল।”
– একা ফিল হলেই বিয়ে করতে দৌড় লাগাতে হবে?
– বয়স হয়েছে তেইশ। এখন না হলে কখন?
– আমার বাইশ।
– ও, তাহলে আপনারও তো বিয়ের বয়স হয়েছে। সিগারেট খাওয়া যাবে?
– আপনি সিগারেট খান?
– টেনশনে থাকলে খাই।
– ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে খেতে পারেন। কিন্তু মা দেখলে আপনার বিয়ের আশা বাদ দিয়ে পালাতে হবে।
– তাহলে থাক। ঝুঁকি নেওয়া ঠিক না।
– তাহলে এখন থেকেই বাদ দিয়ে দিন। বিয়ের পর এসব চলবে না।

সিগারেটের প্যাকেটটা মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম,

– “এগুলো আপনার কাছেই থাকুক তাহলে। আচ্ছা, আপনার নামটাই তো জানা হলো না।”
– আপনার আম্মাকে বলার সময় শোনেননি?
– নাহ, নার্ভাস ছিলাম।
– আমার নাম প্রমী।

০৩/০৭/২০২২, ১০.০০ AM

Obinash

শত শত ষ্পার্মের সাথে যুদ্ধ করে একটি মাত্র ষ্পার্ম মায়ের ওভারিতে পৌছুতে পেরেছিলো। সেটাই আমি, এক ও অদ্বিতীয়। নাম আমার অবিনাশ। যে সব দৃশ্য ভাবায়, বুকের ব্যাথা বাড়ায়, সেসব নোট করে করে বেড়ে উঠছি। একদিন সব সত্য ফাঁস করে দেবো বলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *