তাসের ঘর
বর্তমানে আমরা যে তাস ব্যবহার করছি তা ফ্রান্সের তাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ইংরেজিতে প্রতীকগুলোর নাম হল হার্টস, ডায়মন্ড, স্পেইড আর ক্লাবস। বাংলাতে নামগুলোর পরিবর্তিত রূপ হল হরতন, রুইতন, ইশকাপন এবং চিরতন। ঊনবিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত এই খেলা রাজপরিবার এবং সৈন্য-সামন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে জার্মানির রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কার্ডের নামেও আসে পরিবর্তন। প্রথম দিকে তাসের প্যাকেটে ৭৮টি তাস থাকত। কিন্তু এতগুলো তাস নিয়ে খেলা জটিল ও কষ্টকর হয়ে ওঠায় তাসের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়।
এবার আসা যাক তাসে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রতীকের উৎপত্তির ব্যাপারে। তাসের চারটি প্রতীক পঞ্চদশ শতকের সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর পরিচয় বহন করে । আবার তাসের ছবিগুলোতে উপস্থাপিত হয়েছে ঐতিহাসিক নানা ব্যক্তিত্বের। প্রথমেই ধরা যাক ডায়মন্ডসের কথা। এটি মূলত ধনী শ্রেণীর প্রতীক। তখনকার সময়ে এরা ছিলো শাসক শ্রেণী। ডায়মন্ডস দিয়ে তাদের ধনদৌলত আর ঐশ্বর্যকে বোঝানো হতো। স্পেডস দিয়ে বোঝানো হতো সৈন্যের প্রতীক। স্পেড শব্দটি এসেছে স্প্যানিশ ‘স্পাডা’ থেকে যার অর্থ তরবারি। হার্টস প্রতীকটির আকার ছিল পান পাতার মতো।
পরে ওটা হার্ট বা হৃৎপিণ্ডের আকার পায়। এটা মূলত তখনকার সময়ের পাদ্রীদের প্রতীক। পাদ্রীদের মন পবিত্র ধরে নিয়ে এই প্রতীকের আবির্ভাব। সর্বশেষে ‘ক্লাবস’ যা দ্বারা বোঝানো হতো গরিব মানুষদের। ইংরেজি ক্লাবসের বাংলা হলো ‘মুগুর’। “গরিব শ্রেণীর মানুষের মুগুরই সম্বল” এরকম একটা অর্থ বহন করে এই তাসটি। বিভিন্ন প্রতীকের তাসের গায়ে আছে আবার রাজা, রানী এবং উজিরের ছবি। এদেরও রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রতিফলন। এবার দেখব সেইসব চরিত্র যার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে এই বহুল পরিচিত ছবিগুলো।
ইশকাপন বা স্পেড:
রাজা ডেভিডকে কিং অফ স্পেডস বলা হয় যিনি ছিলেন দৈত্যাকৃতি ফিলিস্তাইন যোদ্ধা গোলিয়াথের হত্যাকারী। বাইবেল অনুযায়ী ডেভিড ছিলেন যিশু খ্রিস্টের পূর্বপুরুষ। এই বিখ্যাত রাজা কখনোই কোনো আবেগের বশবর্তী হয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতেন না। তিনি সব সময় বিচার-বুদ্ধি দিয়ে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতেন। এই তাসের রানী হলেন গ্রিক যুদ্ধ দেবী প্যালাস, যিনি দুই হাতে ধরে আছেন তরবারি ও ফুল। জ্যাকের ছবিটি ফ্রান্সের একটি জনপ্রিয় কাব্যিক চরিত্র।
হার্টস বা হরতন:
৮০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে বিখ্যাত রাজা শার্লেমেন বা চার্লস ইউরোপের প্রায় অর্ধেকের মতো জয় করে ফেলেন। তাসে এই রাজাকে দেখা যায় তলোয়ার নিজের মাথায় ঠেকিয়ে নিজেকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছেন। তাই অনেকে এই রাজাকে আত্মঘাতী রাজাও বলে থাকেন। আরও একটি মজার বিষয় হল তাসের রাজাদের মধ্যে একমাত্র হার্টসের রাজারই কোন গোঁফ নেই। হার্টসের জ্যাক হলো লা হিরে যিনি ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন।


ডায়মন্ডস বা রুইতন:
রাজা জুলিয়াস সিজারের নাম কে না শুনেছে? রোম সাম্রাজ্যের উত্থানে এই প্রভাবশালী শাসকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিং অব ডায়মন্ডস হলেন মূলত রোমের এই বিখ্যাত শাসক, রাজনীতিবিদ এবং সাহিত্যিক। তিনি খুবই দক্ষতার সাথে রোমের রাজনীতি দীর্ঘসময় ধরে নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন। আরো একটি মজার বিষয় হলো, তাসের রাজাদের মধ্যে সব রাজারই মুখ স্পষ্ট দেখা গেলেও একমাত্র রুইতনের রাজারই মুখ অর্ধেক দেখা যায়। কুইন অব ডায়মন্ডস হলেন তারই স্ত্রী রাচেল। গ্রীক এবং রোমান পুরাণ অনুযায়ী “ট্রয়ের” বিখ্যাত যোদ্ধা ছিলেন হেক্টর আর তাকে স্মরণ করেই ডায়মন্ডসের জ্যাক।
ক্লাবস বা চিরতন:
গ্রিসের মেসিডোনিয়ার সম্রাট আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের নাম শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বের দিকে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পৃথিবীর প্রায় পুরোটাই দখল করে বসেন। আর কিং অব ক্লাবসের কিং হলেন এই দিগ্বিজয়ী রাজা। কুইন অব ক্লাবস হলেন একমাত্র ইংরেজ মহিলা যিনি আর কেউ নন ব্রিটিশ রানী প্রথম এলিজাবেথ। তার গোলাম হলেন রাউন্ড টেবিলের বিখ্যাত নাইট, স্যার ল্যান্স লট।


তাস নিয়ে খেলার সময় হয়তো এতো ধরনের কথা আমাদের মাথায় খেলে না। তাসেরও যে রয়েছে ইতিহাস সে সম্পর্কে জানা বা অজানা যাই হোক না কেন তাস খেলায় তেমন প্রভাব পড়ে বলে মনে হয় না। তা সত্ত্বেও এর কিছুটা যদি জানা থাকে সেটা বিশেষ মন্দ নয়, খেলতে খেলতে নাহয় এবার তাসের আড্ডা ভরে উঠুক ইতিহাসে!
১৮/০৭/২০২২, ০৯.০০ AM
