কমলা সুন্দরী ও মহাস্থানগড়ের ইতিহাস
কাশ্মীরের মেয়েরা জগৎ ভুলানো সুন্দরী হয়। কিন্তু আমাদের বাঙ্গালি মেয়েরাও কম যায় না যার জন্য কাশ্মীরের ছেলেরাও পাগল হয়। প্রাচীন পুন্ড্রনগর অর্থাৎ বর্তমান মহাস্থানগড় যখন বাংলার রাজধানী ছিল, তখন সেখানে একটি স্কন্দমন্দির বা কার্তিকের মন্দির ছিল। বলতে গেলে সেসময় সেই মন্দিরটি ছিল এই ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে নৃত্যগীতের শ্রেষ্ঠ জায়গা।
এই স্কন্দমন্দিরের প্রধান নর্তকী ছিল কমলা। সেসময় সে এতো অপরুপা সুন্দরী ছিল যে তাকে দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে রাজা-মহারাজারা আসতেন। কিন্তু সে প্রতি সপ্তাহে মাত্র একদিন নাচার জন্য মানুষের সামনে আসতো ।
কমলা দর্শন
কাস্মীরের রাজা ছিলেন জয়াপীর। তিনি ছদ্মবেশে পুণ্ড্রনগড়ে আসেন দেশের অবস্থা দেখার জন্য। হঠাৎ স্কন্দ মন্দিরে সুন্দরী কমলার নাচ দেখে তার প্রেমে পরে যান। এরপর তাকে বিয়ে করে রাণী বানিয়ে কাশ্মীরে নিয়ে যান।
আমরা আজ যে গান গাই –
“আজি বাহাহাল করিয়া,
বাজানরে দোতরা
সুন্দরী কমলা নাচে”
এটা হল সেই কমলা।
এই জয়াপীর-কমলার গল্পটি লোকের মুখে মুখে এতদিন চলে এসেছে। এখন কথা হল, এই সুন্দরী কমলার অস্তিত্ব কি বাস্তবে আদৌ ছিল, না এটা একটা মিথ?
ইতিহাস সম্পর্কে আরো লেখা পড়ুন –
- রাজ তরঙ্গিনী
- মান্ধাতার আমল
- সপ্তর্ষির সপ্ত ঋষি
- হারমোনি অব দ্যা সিস
- কলকাতার বাঈজী কথন
- মাথিনের কূপ – এক অমর প্রেমকাহিনী
- ইলুমিনাতি – এক গুপ্ত সংঘের অজানা ইতিহাস
- শতবর্ষ পেরিয়ে সাভার অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়
মিথ না ইতিহাস?
আসলে প্রত্যকেটা মিথই ইতিহাস থেকে তৈরি। মানুষ যখন ইতিহাস ভুলে যায়, তখন সেখান থেকে মিথের সৃষ্টি হয়। কমলা সুন্দরী যে মহাস্থানগড়ে বাস্তবে ছিল ও কাশ্মীরের রাণী হয়েছিল তার প্রমাণের খোঁজ পাওয়া যায় কাশ্মীরের কবি কলহন রচিত ইতিহাস গ্রন্থ ‘রাজ তরঙ্গিনী’ তে। আর এটি রচিত হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে অর্থাৎ এখন থেকে নয়শ বছর আগে! আর কমলার অস্তিত্ব ছিল তারও কয়েকশ বছর আগে।
আমাদের নড়বরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
আমাদের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এতোই দুর্বল যে এখন পর্যন্ত মহাস্থানের বংশ পরিক্রমায় রাজাদের নামই বের করতে পারেনি। শুধু হাল্কাভাবে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন বংশ বলে সংক্ষেপে শেষ করে দেয়। এরপর টেনে আনে পরশুরাম আর সুলতান মাহি সওয়ারের গল্প।
অথচ পরশুরাম ও সুলতান মাহি সওয়ার নামের কেউ যে আদৌ ছিল কি না, সেটারই কোন প্রমাণ এখন পর্যন্ত দিতে পারেনি। অথচ কার মাজার কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও, চারশ বছর ধরে মহাস্থানগড় “সুলতান মাহি সওয়ারের মাজার” বলে একটি পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে।
আড়াই হাজার বছর ধরে বাংলাদেশের রাজধানী ছিল অথচ এখন পর্যন্ত মহাস্থানগড়ের মাত্র পাঁচভাগ ইতিহাস বের করতে সক্ষম হয়েছে। বাকি পঁচানব্বই ভাগ ইতিহাসই এখনো অজানা। যদিও বের করার ইচ্ছাও কারো নেই। ইতিহাস বলতে তো আমরা বুঝি শুধু পাকিস্তানের শোষণ, বাহান্ন আর একাত্তর যে ইতিহাস নিয়ে ভোটের রাজনীতি হয়। অথচ বাংলাদেশের প্রত্নতাত্তিক স্থানগুলো এতো বেশি সমৃদ্ধ যে, এগুলোকে যদি ঠিকমত সংরক্ষণ ও গবেষণা করা যায় তবে সাড়া পৃথিবীর লোকজন রোম, মিশর যাওয়ার আগে একবার হলেও বাংলাদেশে আসবে। কিন্তু এদিকে কারো নজরই নেই।
০৩/০৩/২০২২, ১১.০০ AM
