গল্পসাপ্তাহিক সংকলন

কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-২)

[৩]

ক্যাম্পাসের সবচাইতে ড্যাশিং ছেলে আবির। সানগ্লাস চোখে R15 বাইক নিয়ে যখন রাস্তায় নামলা মেয়েরা ২য় বার ঘুরে তাকাতে বাধ্য হয়। তার সুদর্শন চেহারা আর দুষ্টু মিষ্টি কথার জালে যে কোনো মেয়ে খুব সহজেই আটকে যায়। তাই তার জীবনে বেহিসেবি মেয়ের আনাগোনা হয়েছে। সেই সাথে মেয়ে পটাবার কনফিডেন্স লেভেলটাও তার ক্রমাগত বেড়েছে। স্বভাবে তাই সে অনেকটাই উড়নচণ্ডী। এই অপরিচিতাও তেমনই এক ফসল। আবিরের কাছে জীবনের মানেটা খুব ছোট্ট “হেসে খেলে পার করে দেয়া”। রঙিন চশমায় দেখা রঙিন ভুবনের আবির কখনো ভাবেনি জীবন বিষয়ক তার এই থিউরিটা একদিন ভীষণ ভাবে ভুল প্রমাণিত হবে।

ফার্স্ট ইয়ারের একটা সাধারণ মেয়েকে দেখে তার বুকে ধাক্কা লাগে। মেয়েটার কড়া ব্যক্তিত্ব তাকে আকর্ষণ করে। তাদের বিভাগের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে যেখানে সব মেয়েরাই ঝলমলে পোশাকে হাজির মেয়েটা সেখানে গাঢ় নীল রঙের শাড়ী পরে এসেছে। যেন রঙের মুখোশ পরা শহরে এক মায়াবী কন্যার উপস্থিতি। আবির তার বন্ধু দিপু আর নিরবের সাথেই তাদের ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। মেয়েটাকে দেখে তার বন্ধুরাও তার মত ভীমরি খেয়েছে। দিপু বলল,

– দোস্ত হট মুরগী একটা। চল রোস্ট করি?

তার কথায় অন্যরা হেসে বলে “চল” পরীর ডানা ছেটে দেই। ওদের কথায় আবিরের কান নেই। সে কেবল তাকিয়েই আছে মেয়েটার দিকে। মেয়েটা তাদের সামনে আসতেই দিপু বলল,

– আহা অনেক দিন রোস্ট খাই নারে। নীল নীল রঙের ময়ূরবেশী একটা মুরগী খাইতে ইচ্ছা হইতেছে। কই যে পাই?

নিরব বলল,

– “আশেপাশে তাকা ঠিক মত, পেয়ে যাবি মামা। হা হা হা…”।

মেয়েটা তখন হাঁটা থামিয়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। মেয়েটি বলল,

– ভাইয়া আপনার একটা ছবি তুলতে পারি?

দিপু খুশি হয়ে বলল,

– “হ্যাঁ অবশ্যই। আজকাল তো অটোগ্রাফের নয় ফটোগ্রাফের যুগ। কীভাবে পোজ দিলে আপনার ভালো লাগবে?”

– এক পায়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত উঁচু করে দাঁড়ান। আসলে আমার ভাতিজিটার এলিয়েন দেখার খুব সখ। তাই আপনার ছবি নিতে চাইছি।

দিপু রেগে গিয়ে বলল,

– “মানে?”

– মেয়েদের “মুরগী” বলাটা তো কখনো মানুষের কাজ হতে পারে না তাই ভাবলাম আপনি হয়ত এলিয়েন।

দিপু চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল কি বলবে বুঝতে পারছিল না। নিরব তখন বলল,

– “এই তুমি নিউ ফার্স্ট ইয়ার না? সিনিয়র ভাইদের সাথে পাঙ্গা নিতে আসো তোমার সাহস তো কম নয়?

জ্বী ঠিক ধরেছেন। আমার সাহস একটু বেশিই। আর সিনিয়র ভাই যদি জুনিয়র বোনকে “মুরগী” বলে তখন তো পাল্টা জবাব তেমন করেই পেতে হবে। আপনারা যে পথ দেখাবেন সেই পথেই তো হাঁটব, তাই না?


এই লেখিকার অন্যান্য লেখা –


কথা গুলো বলে মেয়েটা চলে যাবার জন্য পা বাড়ায়। পুরো ব্যাপারটা সিনিয়র হিসেবে দিপুর খুব গায়ে লাগে। সে মেয়েটার বাড়ানো পায়ের সামনে তার পা বাড়িয়ে দেয়। মেয়েটা সাথে সাথে হুমরি খেয়ে পড়ে যায়। সেটা দেখে নিরব খিকখিক করে হাসতে লাগল। আবির এতক্ষণ তাকিয়ে দেখছিল মেয়েটা কীভাবে সব হ্যান্ডেল করছিল। কিন্তু দিপু যা করল তা তার কাছে খুবই বাজে লাগে। সে মেয়েটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে “উঠুন” মেয়েটা তার হাত না ধরে উঠে দাঁড়িয়ে দিপুর গালে সপাটে এক চড় বসিয়ে দেয়। তারপর তার মুখের সামনে আঙুল তুলে বলে,

– “ক্যাম্পাসটা পড়ার জায়গা এখানে কেউ অভদ্রতা করলে তার ফলাফল খুব খারাপ হবে। এটা আমার শেষবারের মত বলা। নীলা নাম আমার। জানেন তো নীল সবার সয় না।”

তারপর সে গটগট করে চলে যায়। দিপু বলল,

– “শালীর তেজ একটু বেশিই মনে হচ্ছে।”

আবির সেটা শুনে বলল,

– দিপু কাজটা ঠিক করিসনি। সব সময় অভদ্র ভাষা আর ব্যবহার সব জায়গায় চলে না। মেয়েটা আর ১০টা মেয়ের মত নয়।

– তাই নাকি মামা? আমি তো ভাবলাম বন্ধুর অপমানে কোথায় তুই আমার পাশে দাঁড়াবি এখন দেখি উল্টো গান গাইছিস। কাহিনী কী?

– কাহিনী কী এখনো জানি না। জানার জন্য সময়ের প্রয়োজন। তবে তোরা একে আর বিরক্ত করবি না।

দিপু আর নিরব ওর দিকে প্রশ্নভরা চোখে তাকিয়ে রইল। এ কোন আবিরকে দেখছে ওরা? মেয়ে দেখলে যে ছেলের মুখে হাজারটা কথা চলে আসে সে কি না আজ মুখে তালা মেরে অন্য সুর ধরেছে।

আবির নীলাকে কিছুদিন ফলো করে। তারপর তাকে যে বিশেষণে দাঁড় করায় “মেয়েটা মিশুক, বন্ধুবাৎসল্য, ব্যক্তিত্ববান তবে ভীষণ ডাকাবুকো টাইপ।” এমন মেয়েই তো আবিরের চাই। নীলার সাথে কথা বলতে হবে আবিরের।

[৪]

পরদিন ক্যাম্পাসের সামনের মাঠের পাশ দিয়ে নীলা বই হাতে আনমনে হেঁটে যাচ্ছিল। উদ্দেশ্য হয়ত সামনের বিশাল মেহগনি গাছের নিচে বসা। আবির সোজা তার দিকে হেঁটে গেল। তারপর ইচ্ছে করে নীলাকে ধাক্কা দেয়। হুট করে আসা ধাক্কাটা নীলা সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিল, আবির “সরি” বলে ওর হাতটা ধরে ফেলে বলল,

– আপনার এত পড়ে যাবার অভ্যাস কেন?

– আমার পড়ে যাবার অভ্যেস নেই বরং লোকের ধাক্কা দেয়াটাই অভ্যেস মনে হচ্ছে।

– আপনি এখনো আমার হাত ধরে রেখেছেন। যেভাবে আমার হাত ধরে রেখেছেন তাতে একটা গান মনে পড়ে গেল।

– “তুমি ইচ্ছে হলেই ধরতে পারো আমার হাতের আঙুল।”

 – আচ্ছা?

নীলা নিজেকে সামলে নিয়ে হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,

– “আপনার হাতে করোনা ভাইরাস থাকতে পারে।”

– ভাইরাস তো আমার হাতে আছেই তবে সেটা “করোনা” নয় “ভালোবাসা”। সে কারণেই হয়ত ধরার সাহস পাচ্ছেন না। একবার সাহস করে ধরে দেখুন। বুঝবেন কত কিউট সে জীবাণু।

– “কিউট জীবাণু”। ওসব মেয়ে পটানো ডায়লগ আমার কাছে ঝাড়বেন না।

– আচ্ছা? আগেই পটে যাননি তো?

– আপনার কনফিডেন্স দেখে তো আমার…।

– কি, প্রেম এসে যাচ্ছে?

– আপনার মাথায় কি আর কিছু আসে না?

– আপনি দখলদারি নিয়ে রেখেছেন অন্য কিছু আসবে কি করে?

– দূরে যান তো।

– আমি কখন আপনার কোলে উঠে বসেছি।

– ইচ্ছে তো সেটাই দেখছি।

– আপনার মন চাইছে সেটা। আমি তো অন্য কিছু ভাবছি।

– কি ভাবছেন?

– বাহ্ আমাকে জানার আগ্রহ আছে দেখছি। খুবই ভালো।

– আপনিই জানাবার জন্য পাগল হয়ে আছেন।

– আমি অনেক কিছুর জন্যই পাগল।

– তাহলে পাগলা গারদে যান। এখানে কী চাই?

– গারদে যাবার চেষ্টাই তো করছি। আপনি তো সেটা বুঝতে চাইছেন না।

– সব গারদ সবার জন্য না বুঝেছেন?

– প্রেম বড় অবুঝ, সে এত কঠিন কথা বোঝে না।

– না বুঝলে আমি কি করতে পারি? সে আপনার দায়।

– হুম।

– হুম? ভাগুন তাহলে।

– নাহ।।

– না কেন?

– “মন যারে চায় তারে প্রেম শেখাবো, ছল করে বল করে পোষ মানাবো”।

– এই ভাগুন তো আপনি।

– আপনি কি শুধু ভাগ অংক’ই শিখেছেন? আপনাকে তো এখন আমার গুণ আর যোগ অংক শেখাতে হবে দেখছি।

– বিয়োগ বলেও অংক আছে আমি সেটা ভালো পারি।

– যে অংক সুন্দর জীবনের হিসেবে লাগে না আপনি দেখছি সেই সব ভুলভাল নিয়ম গুলোই শিখেছেন।

– ভালো করেছি আপনার নিয়ম শিখলে ডুবতে হয়।

– একবার আমার ভেতর ডুবেই দেখুন না? ভালোবেসে আপনাকে ডোবাবো, ভাসাবো, হাসাবো, কাঁদাবো, রাগাবো, সব করব।

– আপনার তো দেখছি বাহানার অন্ত নেই। আমাকে ডোবানোর এত বাহানা কেন?

– অনেক বাহানা।


এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –


নীলা নিশ্চুপ। আবীর বলল,  

– কই কিছু বলুন?

– আপনি যন্ত্রণা করছেন কেন?

– আপনি তাহলে যন্ত্রণা পাচ্ছেন? যন্ত্রণা থেকেও প্রেম হয় জানেন? আপনি আমায় যন্ত্রণা দিয়ে ফেলেছেন এখন পাল্টা যন্ত্রণা তো আপনাকে পেতেই হবে।

– আপনাকে ধরে আচ্ছা মতন ধোলাই দিলেই আপনার মাথা ঠিক হবে বুঝেছেন?

– এই তো হচ্ছে।

– কি হচ্ছে?

– মারার ইচ্ছে হচ্ছে মানে আমাকে ছোঁয়ার ইচ্ছে হচ্ছে। আর ছোঁয়ার ইচ্ছে হচ্ছে মানে আপনার মনে প্রেম আসি আসি করছে।

– ওফফফ, পাগল একটা।

– এত কিউট করে “ওফফফ” বলবেন না তো, কলিজায় গিয়ে লাগে।

– আপনার কলিজায় আমি আগুন দিবো।

– সেই আগুনে আমার জীবনে রোশনাই এসে যাবে।

– পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন।

– অলরেডি যাচ্ছি।

– কে বলেছে পুড়তে?

– আমার মন বলেছে।

– আপনি এত বেহায়া কেন?

– “বেহায়া” হওয়াটাও প্রেমের একটা অংশ। আপনার জন্য কোন অংশ বাদ কেন থাকবে বলুন তো?

– “যা খুশি করুন বিদায়।” বলে নীলা গাছের নিচে না বসে সেখান থেকে চলে যেতে চাইল।

– ও হ্যালো… এমন কঠিন পদার্থের মতন বিদায় দিচ্ছেন। পদার্থের আরো দুটো ধরণ আছে পড়েন নাই নাকি?

– না পড়ি নাই। শুধু কঠিন পদার্থই পড়েছি।

– তাহলে আর কি, আসুন আমিই শিখিয়ে নিচ্ছি। তরল পদার্থের মতো বিদায় হচ্ছে – জড়িয়ে ধরে কানে কানে “দেখা হবে” বলা। আর বায়বীয় পদার্থের নিয়মে বিদায় হচ্ছে – ফ্লাইং কিস দিয়ে মিষ্টি হাসির সাথে হাত নাড়া। এখন আপনিই ঠিক করুন কোন ভাবে বিদায় হবেন?

– জ্বী, হাত নাড়লে আবার সেটা আপনার গালে গিয়ে ঠাস করে পড়ে যেতে পারে।

– আবার?

– কি আবার?

– আমাকে ছোঁয়ার বাহানা?

– আমার তো কোনদিন সে ইচ্ছে হবে না তবে আপনি বলে বলে সে ইচ্ছে আমার জাগিয়ে ছাড়বেন মনেহয়।

– তার মানে আমি একদিন সফল হব সেই ইশারা দিচ্ছেন?

– স্বপ্ন দেখতে থাকুন।

– জ্বী, আপনিও দেখুন। তবে প্লিজ স্বপ্নে আর দৌড়ানি দেবেন না। এতো দৌড়ে আমি রীতিমত টায়ার্ড।

– তার মানে আপনি আমায় নিয়ে স্বপ্নও দেখেন।

– দেখি না আবার? স্বপ্নে আমরা কি কি সব করি বলব?

– না।

– শুনে দেখুন না?

– অসম্ভব, এই আপনি যাচ্ছেন না কেন?

– আচ্ছা আপনাকে দেখতে ইচ্ছে হলে কি করব সেটা তো বলে যান?

– কেন? স্বপ্নে দেখবেন।

– আপনি তাহলে চাইছেন আমার স্বপ্নে এসে যা খুশি করতে?

– ওফফফ… (রাগান্বিত স্বরে)

– হা হা হা… আমি কিন্তু ৩য় পদার্থের বিদায় দিলাম।

নীলা একটা রাগী লুক দিয়ে চলে গেল। নীলার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে আবির ভাবল, মেয়েটা দারুণ কথা বলে তো। কেন যেন এর জন্য মনে অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে, যা আগে কোন মেয়ে দেখে হয়নি। কিন্তু একে মানানো এতটা সহজ হবে না। ভীষণ আলাদা টাইপ যে আর আমার জন্য তো এমন স্পেশাল কিছুই চাই। নীলা ততক্ষণে ফোনে কথা বলতে বলতে গেটের কাছে চলে যায়। আবির দেখল এক পুলিশ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আর নীলা তার কাছেই গিয়ে দাঁড়ালো। একবার আবিরের দিকে তাকাল তারপর হাত নেড়ে নেড়ে কি যেন বলতে লাগল। একবার এদিকেও হাত তুলে দেখাল। আবিরের ভ্রু কুঁচকে গেল, ওর নামে নালিশ করছে নাকি?

[চলবে]

০৪/০৫/২০২২, ০২.৫৫ PM

Shamima Zaman

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তৃষ্ণা হলো তার সাথে কথা বলার তৃষ্ণা। কথা আর হয় কই! আমার নৈশব্ধময় সকাল-দুপুর-বিকেল শব্দময় হয়ে রয়, মোবাইলের স্ক্রীনে, কালো অক্ষরে। আমি সেসব নিয়ে ব্লগে অক্ষরের মেলা সাজালাম। একটি করে দিন যায় আর মৃত্যুর দিকে আরও একটি দিন এগিয়ে যাই। হিসেবের খাতায় কী জমা হচ্ছে জানি না। আল্লাহর কাছে শুধু এটুকুই প্রার্থনা ভালো কিছু জমা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *