গল্পসাপ্তাহিক সংকলন

কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৯)

[১৭]

দেখতে দেখতে শুক্রবার চলেই আসল। আবির তার মা বাবাকে নিয়ে নীলাদের বাড়ি এসেছে। খাওয়া দাওয়া আর গল্পগুজবে খুব ভালো সময় কাটল সবার। খাওয়া দাওয়ায় এতটা সময় গেছে অথচ নীলা এখনো একবার আবিরের সামনে পড়েনি। আবির ততক্ষণে উসখুস করছিল নীলার জন্য। নীলার ভাবি সেটা বুঝতে পেরে হাঁসছিল খুব। খোঁচা মারতেও ছাড়ছিল না। তখন আবিরের মা বললেন নীলাকে নিয়ে আসতে। নীলা ঘরে ঢুকতেই আবিরের বুকে ব্যথা করে উঠল। সেই প্রথম দেখায় যেমন হয়েছিল। আবিরের মায়ের দেয়া শাড়ীটা পরেছে। দারুণ লাগছিল। বড়রা সবাই কী বলছিল তা যেন আবিরের কানেই যাচ্ছিল না। আংটি পরানো হয়ে গেলে নীলার ভাবি খেয়াল করল আবির ইশারায় নীলাকে কি যেন বলতে চাইছে। ভাবি তখন বলে উঠল,

– আবির কিছু বলছ?

হুট করে বলায় আবির একটু ছিটকে উঠল। ভাবি মুখ টিপে হেসে উঠে। নীলা নিজেও মুখ টিপে হাসল। নীলা ভাবিকে আস্তে করে ডেকে বলল,

– ভাবি প্লিজ আমাদের একটু একা কথা বলার সুযোগ করে দাও না?

– ইসসস একেবারে ধৈর্য হারা হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়াও ব্যবস্থা করছি।

সে বড়দের উদ্দেশ্যে বলল,

– গল্প আর আলোচনা তো চলতেই থাকবে আমরা নাহয় ওদের একটু একা কথা বলার সুযোগ দেই?

আবিরের মা বললেন,

– হ্যাঁ ওদের ভেতরে নিয়ে যাও।

নীলার ভাবি ওদের নীলার ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন,

– ইসস সেই তখন থেকে দুজনার ইশারা চলছে। এত কিসের কথা, হুম? ফোনে তো সারাক্ষণ দুজন কথা বলেই যাচ্ছ। এখন বল যত কথা, আমি আসছি।

ভাবি বেরিয়ে যেতেই আবির বলল,

– তোমার ভাবিটা চমৎকার।


এই লেখিকার অন্যান্য লেখা –


তারপর সে পুরো ঘরটায় চোখ বুলিয়ে বলল,

– এই তাহলে তোমার ঘর? ভালো। খাওয়া দাওয়া করেছি এবার বিছানার শুয়ে একটু গড়াগড়ি করে নিলে কেমন হয়?

– খুবই বাজে হয়।

– কেন?

– শুয়ে পড়লে ঘুমাতে চাইবেন তারপর বলবেন আজ থেকে যাই।

– এত বোঝো আমাকে!

– হুম, বুঝি তো।

– তাহলে বলো এখন আমার আর কী ইচ্ছে হচ্ছে?

– আমার হাত ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে।

– বাহ্ নিজের ইচ্ছে আমার নামে চালিয়ে দিচ্ছ?

– ইচ্ছে তো নিজের লোকের উপরই চাপায় মানুষ।

– বলছ তাহলে আমি তোমার নিজের লোক? নিজের লোক হিসেবে বলব কী ইচ্ছে হচ্ছে?

– না।

– ঠিক আছে তাহলে হাতটা অন্তত ধরি?

– না।

– নিষ্ঠুর রমণী।

– হা হা হা চলুন বাইরে যাই বড়রা আবার কী ভাববে!

– না। আমি আরও কিছুক্ষণ থাকতে চাই। ঘরটা আমার পছন্দ হয়েছে। পুরো ঘর জুড়ে তোমার স্মেল। বিছানাটায় একটু গড়াগড়ি না দিয়ে যাব না।

বলে আবির শুয়ে পড়ে।

– ভাবিইইইই…।

আবির লাফিয়ে উঠে নীলার মুখ চেপে ধরে বলল,

– ইসসস আমার প্রেস্টিজটা ধ্বংস করতে এত সখ কেন তোমার?

– একটা কুমারী মেয়ের বিছানায় ঘুমাতে চান কেন?

– শোনো এই কুমারী মেয়েটা না আমারই হবু বউ। একটা কথা বলব?

– কী?

– তোমাকে কেমন বউ বউ লাগছে।

– আর আপনাকে গুন্ডা গুন্ডা লাগছে।

– গুন্ডা! তাহলে তো বাংলা সিনেমার ডায়লগ দিতে হয়- “সুন্দরী আজ তোকে একা পেয়েছি, আমার হাত থেকে তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। মুহা হা হা হা…।”

– ভাইয়া কিন্তু ঘরেই আছে।

– উফফ এর মধ্যে আবার ভিলেন কেন?

– কারণ ভিলেন গল্পের অন্যতম সৌন্দর্য। চলুন উঠুন তো এবার। সবাই বসে আছে বাইরে।

– থাকতে দিলে না তোমার ঘরে। আমি কিন্তু এতটা অভদ্র নই। আমার বাড়িতে চিরদিনের জন্য তোমাকে থাকতে দেব।

– আর মনে?

– এই বুকে হাত দিয়ে দেখো?

নীলার মুখ ইষৎ রক্তিম বর্ণ হয়ে গেল। বলল,

– চলুন যাই।


এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –


সপ্তাহ খানেক পর আবির নীলাকে ফোন করে বলল,

– বিকেলে একটু আসতে পারবে? মনে হচ্ছে তোমায় অনেকদিন দেখি না।

– বিয়ের আগে এত দেখেদেখি কিসের হুম?

– ও হ্যালো, ভার্সিটি লাইফে যদি আমার প্রেমটা কবুল করে নিতে তাহলে আমরা চুটিয়ে প্রেম করতে পারতাম। ঘুরতাম, বেড়াতাম। সেগুলো তো সব পাওনা রয়ে গেছে। কিছুটা হলেও এখন তোমার তা শোধ করা চাই।

– বাপরে, এ তো দেখছি পাওনাদার ভয়ংকর। আপনার তো বিজনেস ভাগ্য অতি উজ্জ্বল। চাকরি করছেন কোন সুখে?

– তোমাকে পাবার সুখে। চলো না সিনেমার মত দুজনে নিড়িবিলি কোথাও গিয়ে রোমান্টিক গান গাই, হাত ধরে দৌড়াদৌড়ি করি, নাচানাচি করি?

– আপনি মারামারি করতে জানেন তো?

– এর মধ্যে মারামারি কোথা থেকে এলো?

– না, সিনেমায় তো রোমান্টিক নাচ গান শেষ হতেই একদল ভিলেন এসে হাজির হয়। তাদের তাড়াতে ঢিসুম ঢুসুম মারতে হবে না?

– তোমার তো দেখছি নায়কের চেয়ে ভিলেন নিয়ে ভাবনা বেশি! সব কথায় কুমিরের ল্যাজের মত ভিলেন টেনে নিয়ে আসো। শোনো, তোমার গল্পে নায়ক এবং ভিলেন দুটোই আমি। পালাবার কোনো পথ নেই। বিকেলে চলে এসো। টিএসসিতে বসে চা খাবো এক সাথে।

– জো হুকুম জাহাপনা।

– জাহাপনার মত এত ভারী শব্দ না বলে “জান” এর মত সুইট আর সহজ শব্দটা বললেই তো পারো?

– তু জান জান কারকে মেরি জান লেগায়ি।

– ইসসস… মার ডালা।

[১৮]

নীলা আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন রেখে দেয়। তারপর আবিরের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। আবিরের অফিসের সামনে এসে ফোন করে। আবির নিচে এসে দেখে নীলা রাস্তার উল্টো পাশে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। আবির নীলার সাথে ফোনে কথা বলতে বলতেই যাচ্ছিল, নীলার দিকে তাকিয়ে কখন বেখেয়ালি হয়ে রাস্তায় পা বাড়িয়েছে আবির তা টেরই পায়নি! আর তখনই পাশ থেকে একটা বাইক এসে আবিরকে সজোরে ধাক্কা মারে। আবির ছিটকে গড়িয়ে পড়ে যায় রাস্তায়।

নীলার সমস্ত পৃথিবী যেন মুহূর্তেই দুলে উঠল। সে দৌড়ে গিয়ে আবিরের পাশে বসে পড়ে আবিরের মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। আবির চোখ মেলে ঝাপসা চোখে নীলাকে একবার দেখে, মেয়েটা কেমন অসহায়ের মত কাঁদছে! মায়াবী মেয়েটাকে সে এভাবে আতংকে ফেলে দিল? আবির জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

[চলবে]

০৩/০৬/২০২২, ০৯.০০ AM

Shamima Zaman

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তৃষ্ণা হলো তার সাথে কথা বলার তৃষ্ণা। কথা আর হয় কই! আমার নৈশব্ধময় সকাল-দুপুর-বিকেল শব্দময় হয়ে রয়, মোবাইলের স্ক্রীনে, কালো অক্ষরে। আমি সেসব নিয়ে ব্লগে অক্ষরের মেলা সাজালাম। একটি করে দিন যায় আর মৃত্যুর দিকে আরও একটি দিন এগিয়ে যাই। হিসেবের খাতায় কী জমা হচ্ছে জানি না। আল্লাহর কাছে শুধু এটুকুই প্রার্থনা ভালো কিছু জমা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *