গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-৬)
আঠারো
দোলন আধশোয়া হয়ে বই পড়ছিল। সামনে বিয়ে, বেশ কিছুদিন পড়ার সুযোগ হবে না। তাই সে এখনই পড়া কিছুটা এগিয়ে রাখছে। টানা অনেকটা সময় পড়ার কারণে তার একটু টায়ার্ড লাগছিল। সে ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে খেতে শুরু করে। রাত জেগে পড়ার অভ্যাস বলে ও সব সময় ছোট্ট একটা ফ্লাক্সে চা করে রাখে। চায়ে দু’চুমুক দিতেই তার ফোন বেজে ওঠে, হাতে নিয়ে দেখে শামীম! দোলন একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে, জনাবের তাহলে ফোন করবার সময় হলো? ঠিক আছে আমিও না হয় একটু মজা নেই? সে ফোন রিসিভ করে সালাম দেয়। শামীম সালামের জবাব দিয়ে বলল,
– কেমন আছেন?
দোলন বলল,
– জ্বী ভালো আছি, কিন্তু আপনি কে বলছেন?
শামীম বলল,
– ও সরি আমার নাম বলা হয়নি। আমি শামীম, চিনতে পেরেছেন?
দোলন বলল,
– সরি, কোন শামীম?
শামীম একটু নড়েচড়ে বসে বলল,
– ক’জন শামীমকে চেনেন আপনি?
দোলন তখন নিঃশব্দে হেসে ফেলল। বলল,
– উমমম, একজনকেও চিনি না। তবে একজন সম্পর্কে টুকটাক ধারণা হয়েছে মাত্র।
শামীম বলল,
– হুম, আমি মনে হচ্ছে সেই ধারণাওয়ালা পাবলিক। তো কি রকম ধারণা হয়েছে আমার প্রতি?
দোলন বলল,
– খুবই বাজে ধারণা হয়েছে।
শামীম ভ্রু কুঁচকে বলল,
– যেমন?
দোলন বলল,
– যার সাথে জীবন জুড়ে যাচ্ছে তার সাথে দেখা নেই, কথা নেই। ওসবের কোন ইচ্ছেও হচ্ছে না। শুধু কাজের পেছনে ছোটা একজন মানুষ।
শামীম বলল,
– বাজে ধারণার মানুষের সাথে তাহলে জুড়ে যাচ্ছেন কেন?
দোলন বলল,
– ধারণা বদলাবার জন্য।
শামীম বলল,
– যদি না বদলায়?
দোলন বলল,
– সে তখন দেখা যাবে। আগে থেকে কিছু বলতে চাই না।
শামীম বলল,
– তাহলে বাজে ধারণা কাটাবার জন্য এখন কি করা যায়?
দোলন বলল,
– সেটা তো আপনাকে বলতে হবে।
শামীম বলল,
– আপনি চাইলে একটা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা যায়, সম্ভব?
দোলন বলল,
– না, সম্ভব না।
শামীম বলল,
– ওহ… কেন?
দোলন বলল,
– বাগদানের দিন আপনি আসেননি তাই আপনার একটা পানিশমেন্ট হয়েছে।
শামীম বলল,
– ওহ আচ্ছা, শুরুটা তাহলে বাজে ধারণা আর পানিশমেন্ট দিয়ে হচ্ছে? কি ঝকঝকে কপাল আমার! তো কি পানিশমেন্ট হয়েছে বলুন শুনি?
দোলন বলল,
– আপনি আমাকে সোজা বিয়ের দিন দেখবেন তার আগে নয়।
শামীম বলল,
– পানিশমেন্টটা একটু কঠিন হয়ে গেল।
দোলন বলল,
– আমার অভিমানটাও কঠিন। তবে আপনি আবার ভাববেন না আমি খুব অভিমানী প্রাণী।
শামীম বলল,
– আপনি তাহলে কেমন প্রাণী?
দোলন বলল,
– সে আপনি সময় হলেই জেনে নেবেন। আমি বলব কেন?
শামীম বলল,
– হুম… আচ্ছা ঠিক আছে। তা কি করছিলেন?
দোলন বলল,
– পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে মাথা হ্যাং হয়ে গিয়েছিল তাই একটু ব্রেক নিতে চাচ্ছিলাম। আর আপনি তখনই ফোন করেছেন।
শামীম বলল,
– ওহ, আচ্ছা। আচ্ছা একটা কথা, আপনি কি আমাকে দেখেছেন?
দোলন বলল,
– আপনার কি মনে হয়?
শামীম বলল,
– মনে তো হচ্ছে দেখেছেন।
দোলন বলল,
– ঠিক ধরেছেন।
শামীম বলল,
– আচ্ছা আপনি পড়ুন, আমি তাহলে আর কথা না বাড়াই?
দোলন বলল,
– ঠিক আছে, ভালো থাকবেন। আল্লাহ্ হাফেজ।
বলে দোলন ফোন রেখে দেয়। শামীম তখন ভাবল, মেয়েটা সাথে সাথেই ফোন রেখে দিল! আর কিছুক্ষণ তো কথা বলাই যেত। সে তো জেগেই থাকছে। আর ওদিকে দোলন ভাবছে, আমি আপনার চমৎকার শুরু হতে চাই, সেজন্য আপনাকে একটু কষ্ট তো পেতেই হবে জনাব। আরও কিছুক্ষণ কথা বলাই যেত তবে কি জানেন, আমি চাই আমায় নিয়ে আপনার চাওয়া অতৃপ্ত থাকুক। চাওয়া যতক্ষণ অতৃপ্ত থাকবে আপনি ততক্ষণ আমাকে আরও বেশি করে অনুভব করবেন। আপনার ভাবনার পুরো জগৎ জুড়ে কেবল আমি হব মিস্টার শামীম আহমেদ, বুঝেছেন?
নিচের গল্প গুলো পড়ে দেখতে পারেন –
ঊনিশ
বিয়ে নিয়ে সময় যত যাচ্ছে শামীমের আগ্রহ তত বাড়ছে। কারণ সম্পূর্ণ অদেখা অজানা এক নারী তার জগৎ দখল করতে যাচ্ছে। কীভাবে নতুন করে জগৎটা সাজবে সেই ভাবনায় সে বিভোর। এর মধ্যে দোলন সম্পর্কে জানতে সে শুভকে অনেক প্রলভন দেখিয়েছে কিন্তু কোন কাজ হয়নি। ফাজিলটা এখন থেকেই ভাবীর খাস মুরিদ হয়ে গেছে। একটা কথাও গলানো যাচ্ছে না, এমনকি ঘুষ অফার করেও না! দেখতে দেখতে বিয়ের দিনটা এসেই গেল। বিয়েটা খুব বেশি জাকজমক করে হচ্ছে না। দোলনের বাবা চান খুব ছোট আয়োজনে বিয়েটা হয়ে যাক। খুব বেশি জাকজমক হৈ চৈ তার পছন্দ নয়। তিনি চান সম্পূর্ণ সুন্নতি কায়দায় তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে হোক। যে বিয়েতে খরচ কম, কিন্তু বরকত বেশি থাকে। শিরিন সুলতানাও তাতে আপত্তি করেননি। তাই খুব ছোট্ট পরিসরে বিয়েটা হয়ে যায়। শামীম ভাবছিল বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলে তখন বর বউকে একসাথে করা হবে তখন সে প্রথম দোলনকে দেখবে। কেমন হবে সেই মুহূর্তটা? তার ভীষণ এক্সাইটমেন্ট লাগছে। সময় যাচ্ছিল কিন্তু সেই মুহূর্তের কোন খবর নেই! শুভকে জিজ্ঞেস করলে বার বার এটা ওটা বলে যাচ্ছে। ওদিকে বার বার জিজ্ঞেসও করা যাচ্ছে না। কি যে একটা মুসিবতে পড়েছে শামীম। শুভ তো একবার বলেই বসল,
– কিরে ভাইয়া, তুই দেখছি ভাবীর জন্য একেবারে পাগল হয়ে গেছিস! আসবে তো, তাকে আসার জন্য একটু প্রিপারেশন তো নিতে দিবি?
তখন শামীমের আশেপাশে সব সিনিয়র পাবলিক আর অফিস কলিগরা ছিল, সবার সে কি হাসি। শামীমের লজ্জা আর রাগে গা জ্বলে যাচ্ছিল। হারামজাদা একটু আস্তে করে বলতে পারলি না? গলায় একেবারে মাইক লাগিয়ে বসেছে। মনে হচ্ছে পারলে একেবারে মসজিদের মাইকে গিয়ে এনাউন্স করে দেয়। বাড়ি যেয়ে নেই, তোকে এর মজা টের পাওয়াবো বদের হাড্ডি।
শামীমের ধৈর্যের বাধ শেষ পর্যন্ত শেষ হলো, তবে চূড়ান্ত বিরক্তি নিয়ে। কারণ দোলন নাকি এত বেশি কান্নাকাটি করছিল যে তাকে নাকি কোথাও নেয়াই যাচ্ছিল না। শামীম বুঝল না আজকাল মেয়েরা এতটাও কাঁদে? নাকি একমাত্র মেয়ে বলে আহ্লাদটা একটু বেশি? সেদিন তো অভিমানী প্রাণী নিয়ে কি কি সব বলছিল। শামীম মনে মনে বলল, আল্লাহ্ মালুম কোন বিপদ ঘাড়ে তুলে নিচ্ছি ঘটা করে ব্যান্ড বাজিয়ে! নিজের ব্যান্ড না এখন পার্মানেন্টলি বাজতে থাকে!
এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব- ১)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-২)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব- ৩)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব- ৪)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-৫)
- গল্পটা তোমার আমার (শেষ পর্ব)
বিশ
শামীম তার মাত্র বিয়ে করা একমাত্র বউটার মুখ না দেখেই বাড়ি পর্যন্ত এসে গেল। এদিকে আসার পর থেকে কাজিনরা এটা সেটা নানান হৈ হুল্লোড় করে যাচ্ছে। যেই আহ্লাদী মেয়েটাকে নিয়ে এলো তার কান্না কতটা থেমেছে, কিছু লাগবে কিনা, কিছুই জানা যাচ্ছে না।
একবার শুভকে দেখে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই সে সবার মাঝে গিয়ে মাইকিং শুরু করল যে, শামীম নাকি এখনই বউয়ের চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছে। শামীমের ইচ্ছে করছে হারামজাদাটাকে জুতো পেটা করতে। শুভর কান্ড দেখে শামীম আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দুঃখে ঘর ছেড়ে ছাদে চলে যায়। সেখানেও একগাদা আত্মীয়স্বজন ভীড় করে আছে। তারা তাকে দেখেই খোঁচানো করা শুরু করল। উফফ আত্নিয় স্বজনদের বিয়ে বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা ঝামেলার আগে জানলে কাউকে দাওয়াতই করত না সে। যতসব ফাজিলের ঝাড়। ওদিকে বাসর ঘরে গিয়ে কোন নাটক দেখতে হবে আল্লাহ্ জানে। দোলন যেভাবে কান্না করছে শুনেছে তাতে সারারাত টিস্যু সাপ্লাইয়ের কাজ করতে হবে কিনা কে জানে!
অতঃপর রাত ১১টায় শামীমের কাজিনরা শামীমকে ধরে নিয়ে গেল বাসর ঘরে নিয়ে যেতে। কিন্তু দরজার সামনে যেতেই সব কটা দরজা ধরে হাত পেতে রইল, তাদের টাকা চাই। সারাদিনে শামীম এভাবে কত টাকা যে দিয়েছে তার হিসেব নেই। এবার শামীমের মনে হল, বিয়েতে আসলে কোনো পক্ষের কোনো কাজিন এমনকি নিজের ভাইবোনকেও রাখা উচিৎ না। এগুলা কাজের বেলায় নেই। কিন্তু গেট ধরা, জুতা চুরি করা, হাত ধোঁয়ানো, গেট খুলা সহ ইত্যকার ব্যপারে টাকা চাইবার বেলায় দল ধরে সব কোথা থেকে শকুনের মতো হাজির হয়ে যায় এমকমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন! অগত্যা হাজার পাঁচেক খসিয়ে শামীম তার ঘরে ঢোকার পারমিশন পায়। ঘরে ঢুকেই সে দরজা বন্ধ করে দেয়। কারণ তার কাজিন গুলোকে মোটেও বিশ্বাস নেই। কোন ফাঁকে আর কি বাহানায় ঢুকে ওর টাইম ওয়েস্ট করবে কে জানে। শামীমের মনে বিরহের সুর, মনের গহীনে করুন আর্তনাদ। নিজেই মনে মনে বলে উঠলো – “আহারে এখনো বউটা দেখা হলো না!”
[চলবে]
১৮/০৪/২০২২, ০৯.৩৫ PM
