রক্তাক্ত নূপুর ও চিত্রকর
কৃষ্ণপক্ষ চলছে,তাই চাঁদ এখনো ওঠেনি। আকাশের রঙ ময়ূরের গলার মত রঙিন। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের আড়াল থেকে কিছু তারা উঁকিঝুকি দিচ্ছে। মাঝে মাঝে শাড়ির আঁচল উড়ে যাওয়া বাতাস। নুপুর পায়ে ঝম ঝম করে খুশিতে আত্নহারা হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল ঝিরি, পুরোটা ছাদ জুড়ে। ছাদে অনেকগুলো নয়নতারা ফুলের গাছ। জোনাক পোকার মত সাদা নয়নতারা ফুলগুলো জ্বলজ্বল করছে। ভার্সিটি থেকে ১ মাসের গ্রীষ্মের ছুটি পেয়ে ঝিরি নানাবাড়ি ঘুরতে গিয়েছিল। ২ সপ্তাহ থাকার পর আজ এসেছে। হাতে ধোঁয়াউঠা গরম কফির মগ নিয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার আকাশ উপভোগ করা তার ভীষণ প্রিয়। অনেকক্ষণ ফড়িংয়ের মত সে হাসিখুশি ঘুরে বেড়ালো। তারপর সন্ধ্যা শেষ হয়ে গাঢ় অন্ধকার নামতেই সে ছাদ থেকে নামতে যাবে ঠিক তখনি ফোঁপানোর আওয়াজ শুনতে পেলো, চিলেকোঠার ঘর থেকে।
সে খেয়ালই করেনি চিলেকোঠার ঘরটা ভাড়া হয়ে গেছে। কান পেতে শুধু সে চাঁপা কান্নার আওয়াজই শুনতে পেলো। মাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো একজন ব্যাচেলর আর্টিষ্ট চিলেকোঠার ঘরটা ভাড়া নিয়েছে। কারো সাথে নাকি বেশি কথা বলেনা। অনেক সকালে বের হয়ে যায় আর রাতে ফিরে। এখন যখন-তখন ছাদে যাওয়া যাবেনা, এই কড়া নিষেধও আরোপ করা হলো ঝিরিকে। কিন্তু ততক্ষণে ঝিরির কৌতুহলের মাত্রা আরো বেড়ে গেলো। একজন আর্টিষ্ট এভাবে নিজেকে কেন এতটা লুকিয়ে রাখবে আর কাঁদবেই বা কেন? পরদিন সন্ধ্যায় ঝিরি চুপ করে আবার ছাদে উঠলো কিন্তু চিলেকোঠার ঘরটা তালা দেয়া দেখলো। তারপর এভাবে কয়েকদিন ঘরটা তালা দেওয়া দেখে সে কৌতুহলের সমাপ্তি টানতে সিদ্ধান্ত নিলো, ঘরটাতে সে ঢুকবে। টিভিতে দেখতো চুলের ক্লিপ দিয়ে তালা খোলা যায়।
তাই সে চেষ্টা করে দেখলো। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর তালাটা সে খুলতে পারলো। স্বস্তির হাফ ছেড়ে খুব সন্তর্পণে ঘরটাতে ঢুকলো। একটাই রুম আর এটাচড বাথরুম আর কিচেন। রুমটাতে দুটো বড় ল্যাম্পশেড আবার দেয়ালে ঝুলানো একটা ল্যাম্পশেড, একটা বড় ডিভান, দুটো চেয়ার,সিডি প্লেয়ার আর ঘরের এক কোণে ছবি আঁকার সরণ্জামাদি। সেখানে একটা বড় ক্যানভাস সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা। প্রচন্ড কৌতুহল নিয়ে চাদরটা সরাতেই সে দেখতে পেলো পেন্সিল দিয়ে আবছা একটা পায়ের স্কেচ আঁকা। আপাতত এটুকু দেখেই সে তাড়াতাড়ি দরজায় তালা দিয়ে বেড়িয়ে গেলো। তারপর কয়েকদিন সন্ধ্যেবেলা ঝিরি ছাদে এসে দেখলো দরজায় তালা নেই। তার মানে লোকটা ভিতরে আছে। ভয়ে ভয়ে সে চুপ করে চলে গেলো। এভাবে সপ্তাহখানেক পর এক সন্ধ্যায় সে চিলেকোঠার ঘরটা তালা দেওয়া দেখলো। কৌতুহলে সে অস্হির হয়ে উঠেছিল। ক্লিপ দিয়ে ঝটপট তালাটা খুলে ঘরে ঢুকে ঝিরি দেখলো সব জিনিস ছড়ানো ছিটানো, ল্যাম্পশেড গুলোও পড়ে আছে মেঝেতে। সে বুঝতে পারলোনা, লোকটার যদি এত ল্যাম্পশেডের আলো পছন্দ তাহলে সে নিজেকে এত আড়াল করে রাখে কেন?
কিন্তু ক্যানভাসটা আজও চাদর দিয়ে ঢাকা। চাদরটা সরাতেই সে চমকে উঠলো, কারণ সেই পা’টা অদ্ভুত সুন্দর করে রঙ করা হয়েছে। শুধু একটা পা আর তাতে একটা নুপুর ঝুলছে তবে সেই পা থেকে কয়েকটা রক্তের ফোঁটা ঝরে পড়ছে। ঝিরি কোনভাবেই এর মানে খুঁজে পেলোনা। ক্রমেই সে আরো উৎসুক হয়ে উঠলো। তখন হঠাৎ সিঁড়িতে শব্দ পেয়ে সে খুব তাড়াতাড়ি করে ছবিটা ঢেকে দরজায় তালা দিয়ে ছাদে পেয়ারা গাছের বড় এক ড্রামের আড়ালে লুকিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর লোকটা এসে খুট করে তালা খুলে রুমটায় ঢুকে গেলো। ঝিরি লোকটার ছায়া শুধু দেখতে পেলো, প্রচন্ড ভয়ে কথা বলার অদম্য ইচ্ছাটাকে তার মাটিচাপা দিতে হলো। তারপর বিড়ালের মত পা টিপে যেতে যেতে তার পায়ের দিকে চোখ যেতেই তার গলা শুকিয়ে গেলো। কারণ এক পায়ে একটা নুপুর নেই। এবার নিশ্চয়ই লোকটা তার বাবাকে বলে দিবে। এই চিন্তায় রাতে তার ঘুম হলোনা।
পরদিন সন্ধ্যায় ঝিরি আবার ছাদে এলো আশা নিয়ে যে, ঘরটা থেকে নুপুরটা নিয়ে যেতে পারবে। যেহেতু এখন পর্যন্ত তার বাবা তাকে কিছু বলেনি, তার মানে লোকটা এখনো কোন অভিযোগ করেনি। খুব ধীর পায়ে চিলেকোঠার ঘরের কাছে যেতেই হঠাৎ দরজাটা খুলে গেলো। সে তাড়াতাড়ি দেয়ালের পাশে লুকিয়ে গেলো আর লোকটার একটা ছায়া শুধু মেঝেতে দেখতে পেলো। ঝিরির দম বন্ধ হয়ে আসছিল আর তখুনি প্রচন্ড রাশভারী কন্ঠটা সে শুনতে পেলো,
– “এটাইতো খুঁজছেন? এই নিন আপনার নুপুর। আর এভাবে অনধিকার প্রবেশ আমি একদম পছন্দ করিনা”।
ঝিরির হতভম্ভ ভাব তখনো কাটেনি। কিছু বলে উঠার আগেই নুপুরটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে দরজাটা খটাস করে আটকে দিলো লোকটা।
প্রচন্ড কষ্ট আর অপমানিত হয়ে সে নিজের ঘরে ফিরে এলো। সারাটা রাত ফুঁপিয়ে কাঁদলো। লোকটার এত অহমিকা কিসের? নিজেকে এত আড়াল করার মানে কী? সে যদি বুঝতেই পারে কেউ তার রুমে ঢুকেছিল তাহলে বাবাকে কমপ্লেইন কেন করেনি? লোকটা কেন ঝিরিকে কথা বলার সুযোগ দিলোনা? একরাশ প্রশ্লের উত্তর না পেয়ে হতাশ হয়ে আনেক দেরিতে সে ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন সকালে অনেক বেলা করে তার ঘুম ভাঙলো। আর চারদিকে হৈ চৈ। মাকে জিজ্ঞেস করে জানলো, চিলেকোঠার ভাড়াটিয়া আজ সকালে চলে গেছে। ঝিরির তখন মনে হলো, চিৎকার করে কাঁদে। নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করলো যে তার জন্যই চিলেকোঠার লোকটা চলে গেল।
তাকে জানতে চাওয়া? তার বিষাদের ছবির মানে জানতে চাওয়াই কি আমার অপরাধ ছিল? ঝিরি হাত-মুখ না ধুঁয়ে দৌঁড়ে ছাদের ঘরে গেলো। যদি এখনো আরেকটাবার সে আসে, কিছু ফেলে গেলে গেছে তা নেয়ার জন্য। হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এসে দেখে তার ছোট ভাই দাঁড়িয়ে। হাতে বড় একটা ক্যানভাস। ঝিরিকে দেখেই বললো,
– “লোকটা খুব জিনিয়াস রে আপু। দেখ না, কী ভালো ছবি আঁকে। প্রত্যেকটা ছবিতে কী ভীষণ আলো-ছায়ার খেলা।”
ঝিরি স্হির হয়ে দাঁড়িয়ে কান্না চাপিয়ে কথাগুলো শুনছিলো। তারপর ওর ভাই বললো,
– “আর যাওয়ার সময় লোকটা এই ছবিটা তোকে দেবার কথা বললো”।
ঝিরি কাঁপা হাতে ছবিটা নিয়ে চমকে উঠলো, এই সেই পায়ের ছবিটা। কোন কিছুতে চাপা পরা রক্তাক্ত একটা কোমল পা থেকে একটা নুপুর ঝুলছে আর কিছু রক্তের ফোঁটা। শুধু একটা রক্তাক্ত পা একেই কত সহজে কষ্টের রূপ ফুঁটিয়ে দিয়েছে লোকটা। ঝিরির খুব কষ্ট লাগছিল। তখন ছবিটা উল্টাতেই একটা কাগজ স্কচটেপ দিয়ে আঁটকানো দেখলো। তাড়াতাড়ি সে খুলে দেখলো একটা চিরকুট। তাতে লেখা, “কাল রাতের ব্যবহারের জন্য দুঃখিত। কিছু মনে করবেন না, এভাবে আপনাকে লিখছি দেখে। আমি আপনাকে দেখিনি এবং নামটা পর্যন্ত জানিনা। তাই সম্বোধন করতে পারলাম না। শুধু আপনার পায়ের নুপুরের আওয়াজ শুনতাম, যখন ছাদে আসতেন। যেদিন প্রথম আমার রুমে ঢুকেছেন সেদিনই আমি টের পেয়েছি। মূলত আমার সম্পর্কে আর এই ছবিটার ব্যাপারে আপনার কৌতুহল যথেষ্ট, তা টের পেয়েছি। তাই পালিয়ে বাঁচলাম। না, একদম আত্নগ্লানিতে ভুগবেন না। জানেনতো কারোরই কষ্টের পুনরাবৃত্তি সহ্য হয় না। সত্যি বলতে, আমারও হয়নি। ব্যাপারটা তাহলে খোলাসা করেই বলি, আপনার কৌতুহল দমনের জন্য।”
“আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার স্টুডেন্ট ছিলাম। ভর্তি হবার ১ বছর পর একজনকে ভালো লেগে গেলো। আমরা একসাথে ঘোরাফেরা করতাম, সবাই আমাদের মোষ্ট হ্যাপি কাপল হিসেবেই জানতো। পাশ করে বের হবার পর চলার মত একটা চাকরিও হলো, এছাড়া আঁকিবুকিও করতাম। দুই পরিবারের সম্মতি ছিল আমাদের বিয়ের জন্য। অনেকে প্রেয়সীর রূপ দেখে, চোখ দেখে মুগ্ধ হয় আর আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম ওর পা দেখে। মনে হতো ঐ পা দুটো ধরে আমি সৌন্দর্যের আরাধনা করি। দুজনের মাঝে মজার মজার সব খুঁনসুটিও হতো। কিন্তু আমাদের দুজনার ভালোবাসাবাসি ছিলো স্থায়ী, অটুট। প্রথম চাকরীর বেতন পেয়ে ওর জন্য একজোড়া নুপুর কিনেছিলাম। গত বছর ফেব্রুয়ারীতে সোনারগাঁ ঘুরতে যাবো ভেবে বাসে উঠলাম আমরা গুলিস্তান থেকে। বাসে উঠেই নুপুরটা ওর পায়ে পরিয়ে দেই। কিছুক্ষণ পর ওর সাথে আমার হালকা খুঁনসুটি হলো। আমিও রাগ দেখানোর ভান করে বাস থেকে নেমে তার পরের বাসে উঠলাম। ও ঠিকই জানতো, আমি আছি আশেপাশেই। ভাবলাম একেবারে সোনারগাঁ নেমে ওকে চমকে দিবো। তাই একটুপর বাসে আমি হঠাৎ ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙতেই অনেক শোরগোলের আওয়াজ শুনলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করতে বললো, সায়েদাবাদে একটা চলন্ত ট্রেনের সাথে হঠাৎ ব্রেকহীন এক বাসের দুর্ঘটনা হয়েছে। আমার দুনিয়াটা কেঁপে উঠলো অজানা আশঙ্কায়। মনকে প্রবোধ দিলাম, অন্য কোন বাস হবে হয়তো। তবুও ভীড় ঠেলে ছুটে গেলাম,। সামনে সব লন্ড-ভন্ড, রক্তাক্ত ছিন্ন ভিন্ন কিছু শরীর। চোখ আঁটকে গেলো, একটা নুপুর পরা রক্তাক্ত পায়ের দিকে। তারপর আর কিছু কি বলার থাকতে পারে? ঐ যে শুরুতে বললাম, মানুষ কষ্টের পুনরাবৃত্তি সহ্য করেনা। আমিও করতে চাইনা। কষ্ট পাবেন না। নুপুরের শব্দ এখন আমার আর সহ্য হয় না। কষ্টে মানুষ মরে যেতে চায় কিন্তু আসল সত্য কি জানেন, অতি কষ্টে মানুষ মরে যাওয়ার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলে। প্রকৃতির হয়তো তাই নিয়ম। আমার রাত-দিন যাচ্ছে কষ্টার্জিত সত্যের মুখোমুখি হয়ে। এই ছবিটা অনেক কষ্ট থেকে আঁকা, বুঝতেই পারছেন। আপনি আমাকে জানতে আর ছবিটা দেখতে ছাঁদে আসতেন। লুকিয়ে লুকিয়ে। তাই ছবিটা আপনাকে দিয়ে গেলাম আর দিলাম ছবিটার ইতিহাস। এর বেশী জানতে বা খুঁজতে চেষ্টা করবেন না আমাকে। থাক না কিছু কৌতুহল, আর কিছু কষ্ট মেঘের আড়ালে। হারিয়ে যাক শূন্যতায়।
০৬/০৫/২০২২, ১০.০০ AM
