গল্পসাপ্তাহিক সংকলন

কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৮)

[১৫]

শুক্রবারকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারেই একটা উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে যায়। তারই প্রস্তুতি স্বরূপ আবির ওর মাকে নিয়ে এনগেজমেন্টের জন্য আংটি কিনতে যাচ্ছিল। হাতের মাপ লাগবে বলে আবির নীলাকেও ফোন করে আসতে বলে দিয়েছে। আবিরের মায়ের সাথে নীলার প্রথম দেখা হবে আজ। তারা দুজনেই এই নিয়ে এক্সাইটেড। নীলা শপিং মলে আসার পর আবিরের মা নীলাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন,

– কী মিষ্টি মেয়ে! মাশা-আল্লাহ আমার আবিরের পছন্দ আছে বলতেই হয়। তবে আমার আবিরও কোনো অংশে কম নয় কিন্তু।

নীলা খানিকটা লজ্জা পেয়ে গেল। আবির বলল,

– দেখলে নীলা? আমার মা কিন্তু নিজের ছেলের প্রশংসা করতে ছাড়ল না।

– নিজের ছেলের প্রশংসা করব না তো কী? ছেলের যদি গুণই না থাকত তাহলে কী নীলার মত এমন মেয়ে পাওয়া যেত? চলো দাঁড়িয়ে না থেকে গল্প করতে করতে কেনাকাটা করি। তুমি কিন্তু একদম আনইজি ফিল করবে না। তোমার কোনো পছন্দ আছে? থাকলে বলো, সেভাবেই কেনাকাটা হবে। একদম আনইজি ফিল করবে না।

– না আন্টি, তেমন কোনো পছন্দ নেই।

– গোল্ড না ডায়মন্ড পছন্দ করবে?

নীলা কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কারণ এসবে সত্যিই তার কিছু বলার নেই. নীলার চুপ করে থাকা দেখে আবিরের মা বলল,

– ঠিক আছে চলো আগে ডায়মন্ড দেখি। আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা।

তারা ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড এ ঢুকে পড়ল। কয়েকটা রিং আবিরের মায়ের পছন্দ হয়, সেখান থেকে নীলাকে একটা সিলেক্ট করতে বলে। নীলা কনফিউজড হয়ে যায় কোনটা নেবে? তখন সে আবিরের দিকে তাকায়। চোখে প্রশ্ন

“আপনি পছন্দ করে দিন না?” নীলার প্রশ্নময় চাহনি দেখে আবির বুঝতে পারল ও কি চাইছে? তারপর সে রিং সিলেক্ট করে দেয়। রিং কেনা হয়ে গেলে আবির বলল,

– এরপর কী কিনবে?

আবিরের মা নীলাকে জিজ্ঞেস করলেন,

– তোমার আর কিছু কেনার আছে?

নীলা বলল,

– আর কিছু তো কেনার নেই।

আবিরের মা বললেন,

– তাহলে চলো একটা শাড়ী কিনি।

শাড়ীর দোকানে বসে তারা অনেক শাড়ী দেখছিল। কিন্তু নীলা কোনটা নেবে বুঝে উঠতে পারছিল না। আবিরের মা তো বলেই যাচ্ছে এটা নাও, ওটা তোমাকে বেশি মানাবে। নীলা শেষমেশ একটা মেরুন রঙের শাড়ীতে হাত দেয়, একই সাথে আবিরও ওই শাড়ীটাতেই হাত রাখে। দুজনই অবাক হয়। তারপর আবির হেসে ফেলে। নীলা বলল,

– আন্টি এই শাড়ীটা নেই?

– পছন্দ হলে অবশ্যই নেবে।


এই লেখিকার অন্যান্য লেখা –


অবশেষে একটা মেরুন কালারের শাড়ী কিনে তারা তাদের কেনাকাটা শেষ করল। তারপর তারা ফুডকোর্ডে গিয়ে এক সাথে বসে খেতে খেতে অনেক গল্প করে। খাওয়া শেষ হলে আবিরের মা আবিরকে বলল,

– আমি গাড়ি নিয়ে চলে যাচ্ছি তুই নীলাকে পৌছে দিয়ে আয়। আবির মাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে নীলাকে নিয়ে রিকশায় উঠে পড়ে। নীলাকে বলল,

– এটা আমাদের প্রথম একসাথে রিকশায় ওঠা, তাই না?

– হুম।

আবির তখন ছোট্ট একটা প্যাকেট বের করে দিয়ে বলে,

– এটা আজকের জন্য।

– এটা কখন নিলেন?

– নিলাম তো।

– আজ যদি একসাথে রিকশায় না ওঠা হত তাহলে?

– হবে না কেন? আম্মুকে যেভাবেই হোক পাঠিয়ে দিয়ে তোমাকে নিয়ে রিকশায় উঠে পরতাম। আর আমার মা কিন্তু মোটেই বেরসিক নয় সে ছেলের মন পড়তে জানে।

– আপনি সব কিছুর জন্য গিফট রাখেন, সে হিসেবে আরেকটা গিফট হয়।

– কোন হিসেবে?

– আজ আপনার মায়ের সাথে আমার প্রথম দেখা, সে হিসেবে।

– তাই তো! এটা তো মাথায় আসেনি।

– মাথায় কে থাকে কে জানে।

বলে নীলা মুখ টিপে হাসল।

– হুম কে যে থাকে।

নীলা তখন তার হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে আবিরের হাতে দেয়। বলে,

– আজ আন্টির সাথে প্রথম দেখা তাই এটা তার জন্য।

– ও বাবা! আজ অব্দি আমার জন্য কিছু হল না আর আন্টির জন্য প্রথম দেখাতেই গিফট।

– সে আমাদের মা মেয়ের ব্যাপার আপনি এর মধ্যে ঢুকবেন না।

– ও তাই না? এখনই “মা-মেয়ে” হয়ে গেল আর আমি কী বন্যার পানিতে ভেসে আসা?

নীলা খুব হাসল সেটা শুনে। বলল,

– সেটাই তো মনে হচ্ছে।

– মনে হওয়ার শোধ নেব। চিন্তা করো না।


এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –


[১৬]

নীলাকে নামিয়ে দিয়ে আবির বাসায় চলে আসে। বাসায় এসে তার মায়ের হাতে নীলার দেয়া ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,

– নাও, তোমার জন্য গিফট পাঠিয়েছে।

– কে পাঠিয়েছে?

– যে তোমাকে বশ করে সব কিছু নিজের কব্জায় নিয়ে ফেলতে চায়।

– কি আশ্চর্য, আমাকে কে বশ করতে চাইবে?

– নীলা চাইছে। এটা দিয়ে বলেছে আমি যেন তোমাদের “মা-মেয়ের মধ্যে না ঢুকি” এখনই আমাকে পর করে দিচ্ছে ভাবা যায়?

আবিরের মা হাসলেন।

– কই আমাকে না দিয়ে তোর হাতে দিল কেন? দেখি কী পাঠিয়েছে?

প্যাকেট খুলে দেখে ভেতরে একটা বক্স, তার উপর লিখা –

“আন্টি,

আপনার সাথে প্রথম দেখা। কী নেব বুঝতে পারছিলাম না তাই ভাবলাম নতুন আর ভালো কিছুর শুরু মিষ্টি দিয়ে হয় তাই আপনার পছন্দের পুডিং বানালাম।”

বক্স খুলতেই বেরিয়ে এলো একটা ক্যারামেল্ড পুডিং। আবিরের মায়ের কাছে ব্যাপারটা খুবই ভালো লাগল। পুডিং আবিরেরও ভীষণ পছন্দ। নীলা পুডিং পাঠিয়ে আসলে আন্টি আর আন্টির ছেলে দুজনেরই ভালোবাসা পেতে চেয়েছে। মেয়েটা ভালো না হলে এত সুন্দর করে ভাবতে পারত না। আবির রাতে নীলাকে ফোন করে বলল,

– তোমার দূর-অভিসন্ধি সাক্সেস।

– মানে?

– মানে আন্টির কাছে পুডিং পছন্দ হয়েছে।

– আর আন্টির ছেলের?

– পুডিং তো তার জন্য ছিল না।

নীলা একটু আহত হল। সে তো দুজনের জন্যই পাঠিয়েছিল। সে শুকনো মুখে বলল,

– ও…।

আবির হেসে ফেলল, বলল,

– আন্টির ছেলে অবশ্য পুডিং মিস করেনি। তার হবু বউয়ের রান্না করা পছন্দের জিনিস প্রথমবার খাওয়ার সুযোগ হয়েছে সেটা তো এমনি এমনি ছেড়ে দেয়া যায় না, বলো?

– ছোঁচা কোথাকার।

– রোমান্টিকও খুব।

[চলবে]

৩১/০৫/২০২২, ১০.০০ AM

Shamima Zaman

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তৃষ্ণা হলো তার সাথে কথা বলার তৃষ্ণা। কথা আর হয় কই! আমার নৈশব্ধময় সকাল-দুপুর-বিকেল শব্দময় হয়ে রয়, মোবাইলের স্ক্রীনে, কালো অক্ষরে। আমি সেসব নিয়ে ব্লগে অক্ষরের মেলা সাজালাম। একটি করে দিন যায় আর মৃত্যুর দিকে আরও একটি দিন এগিয়ে যাই। হিসেবের খাতায় কী জমা হচ্ছে জানি না। আল্লাহর কাছে শুধু এটুকুই প্রার্থনা ভালো কিছু জমা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *