জীবন স্রোতে
স্রোতের বিপরীতে চলা মোটেই সহজ নয়। যারা নদীতে সাঁতার কেটেছে তারা জানে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা কতটা কঠিন। হয়তো নিজের সীমাবদ্ধতাকে মানতে না পারার ইচ্ছায় স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে গিয়েছি। কিছুদূর গিয়ে পেশি আড়ষ্ট হয়ে আসে, হাত পা আর চলতে চায়না, চুপচাপ ঘুমিয়ে যেতে ইচ্ছা করে হাত পা ছেড়ে দিয়ে। ক্ষনিকের অসাবধানতায় নিজের অজান্তেই হয়তো নাকে মুখে পানি ঢুকে যায়, ফুসফুস একটু অক্সিজেনের জন্য হাঁসফাস শুরু করে। কি যে ভীষণ ইচ্ছা করে তখন বেঁচে থাকতে!
কয়েকবারই পানিতে ডুবতে ডুবতে রিয়েলাইজ করতে পেরেছি বেঁচে থাকার ইচ্ছা কতটা প্রবল হতে পারে। সামান্য একটু অক্সিজেন ফুসফুসে পৌছানোর জন্য প্রায় নিস্তেজ হয়ে যাওয়া ব্রেন হঠাতই কাজ করতে শুরু করে। নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে থাকে অনেকটা অটো পাইলটের মত। কিছুটা অক্সিজেন ফুসফুসে পৌছালে তখন আবার হাত পা চালু হয়, তীরের দিকে ফিরে আসা সহজ হয়ে যায় অনেকটাই।
এদিকে বিরুদ্ধ স্রোত, শরীরের নীচে অতল মৃত্যু গহ্বর আর অন্যদিকে তীরে থাকা জীবনের মাঝে বেঁচে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষাই ফারাক তৈরি করে দেয়। তীরে ফিরে নিজের উপর বিশ্বাসটা আরেকটু পোক্ত হয়। বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পাওয়া যায়। পানির মতো জীবনেও বিরুদ্ধ স্রোতে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সাঁতার কাটতে হয়।
যদি নিজের স্বপ্ন ছোঁয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে বুকের মধ্যে সাহস আর কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার অসম্ভব মানসিক শক্তিই হতে পারে একমাত্র ভরসা। ডুবতে বসলে কাউকে পাশে নাও পাওয়া যেতে পারে কিন্তু নিজের আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্ন দৃঢ় না হলে তীরে পৌঁছানো হয়তো সম্ভব না।
একটাই জীবন, অথচ সেই জীবনটাকে কত উদ্দেশ্যহীনভাবে খরচ করি আমরা। কিছু মানুষের কাছে জীবন মানেই টাকা। আমি তাদের দোষ দেবনা। কারন হয়ত জীবনের কিছু সময়ে টাকার অভাব প্রচন্ডভাবে বোধ করেছিলেন তারা। তাই পরবর্তী জীবনে টাকাকেই তারা ধ্যান জ্ঞান বানিয়ে ফেলেন। আমি ঘৃণা করি টাকার নেশাকে। যারা ভাবে, যত বেশি টাকা তত বেশি বিলাসিতা। আবার কিছু মানুষ আছে যারা ভালোবাসে প্রতিষ্ঠা।
প্রতিষ্ঠা বা ইষ্টাব্লিশমেন্ট এর সংজ্ঞা কি? বড় ব্যাবসা, চাকরি, টাকা পয়সা, গাড়ি, বাড়ি হলেই প্রতিষ্ঠিত সে জীবনে! কি হবে সেই প্রতিষ্ঠা দিয়ে যদি পরিবারের লোকেরাই পাঁচ মিনিট সময় কাছে পেল না সেই সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত মানুষটা কে? সেই মানুষটা জানলই না কখন তার প্রিয় মানুষগুলি কি চায়।
আমার কাছে প্রতিষ্ঠা মানে সুখি হওয়া, নিজের অবস্থান থেকেই নিজেকে পূর্ণ মনে করা। তাই আমি একজন সুখি মানুষ। আমি আমার অবস্থান নিয়ে কোন অনুশোচনায় ভুগি না কখনও। যা করি নিজের বুদ্ধিতে করি। এবং পরাজয়কে অভিজ্ঞতা হিসাবে নিতে চেষ্টা করি। কতদিনই বা আর বাঁচবো। কি দরকার জটিলতা বাড়িয়ে। টাকা দরকার। কিন্তু তা যেন আমাদের স্বকীয়তাকে নষ্ট না করে দেয়।
আমাদের চারপাশে পৃথিবীটাকে চেনার পথ যেন বন্ধ না হয়ে যায়। পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ যেন সবাই পায়। মানুষের যান্ত্রিকতা দেখতে ভালো লাগেনা একদম। কেউ কাউকে চিনিনা আমরা আজকাল, চিনতে চেষ্টা ও করিনা খুব একটা। সবাই সবার নিজের তৈরী করা বৃত্তের মাঝে বন্দী। আর দিন শেষে একাকীত্ব একাকীত্ব করে হাপিয়ে মরি।
০১/০৬/২০২২, ১০.২০ AM
