মনিব ভক্ত হাচিকো
জাপানে গিয়েই উঠেছি আরেক বাঙ্গালী ভাই রাব্বির রুমে। সে হিসেবে আমি রাব্বির রুমমেট। রাব্বি আমার বছর ২/৩ আগে থেকেই জাপানে থাকে। বেশ ভালোই জাপানিজ বলতে পারে। ছেলে হিসেবে খুব হাসি খুশি, বন্ধু বৎসল অর্থাৎ এক কথায় চমৎকার একটি ছেলে। এমন একজনকে রুমমেট হিসেবে পাওয়াটাও ছিলো ভাগ্যের ব্যপার। সাধারনত যারা বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকেন তারা জানেন মনের মতো রুমমেট না হলে কি প্যারাটাইনা নিতে হয়। না যায় সওয়া, না যায় বলা। কথা প্রসঙ্গে বার বার জাপানের কথা চলে আসে তার কারন, আমার জীবনের খুব উল্ল্যেখযোগ্য অংশে এই জাপান ভ্রমন গেঁথে আছে। টোকিওর যেখানেই আমি গিয়েছে, তা এই রাব্বির সাথেই। একদিন সে আমাকে নিয়ে গেলো জাপানের অন্যতম ব্যস্ত স্থান শিবুয়াতে। সে যাই হোক, শিবুয়ার ট্রেনষ্টেশনকে ঘিরে একটি খুব মর্মান্তিক ঘটনা আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।



সময়টা ১৯২৩, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসরের একটি পোষা কুকুর ছিল নাম হাচিকো। মনিব ট্রেনে করে তার কর্মস্থলে যেতেন, আর কুকুরটি প্রতিদিন তার মনিবকে বাড়ী থেকে নিকটস্থ রেল স্টেশন পর্যন্ত পৌছে দিত এবং সন্ধ্যায় তিনি ফিরে আসার আগেই স্টেশনের গেটে উপস্থিত থাকতো। সময়টা তখন ১৯২৫ সালের মে মাসের কোন একদিন, রোজকার মত হাচিকো তার মনিবকে স্টেশন অবধি পৌছে দেয়। আবার সন্ধ্যয় ফিরে আসার আগে হাচিকো তার স্বভাব বশত স্টেশনে উপস্থিত থাকলেও তার মনিব আর ফিরে আসেননি। কর্মস্থলেই তিনি মারা যান।
জাপান সম্পর্কে অন্যান্য লেখা পড়ুন –
- জাপান নামা
- যুক্তিযুক্ত দিবস
- চোরনামা নাকি জাপাননামা
- জাপানঃ নিঃস্বার্থ এক বন্ধুর নাম
- সংসদ বায়োষ্কোপ কিংবা চিড়িয়াখানা
- জুনকো ফুরুতা – নিকৃষ্টতম নির্মমতার শিকার
মনিবের অপেক্ষায় হাচিকো রোজ ঐ স্টেশনে অপেক্ষা করতে লাগলো। প্রফেসরের পরিবার উক্ত শহর ছেড়ে চলে যাবার সময় হাচিকোকে সাথে করে নিয়ে গেলেও পরবর্তীতে হাচিকো আবার আগের স্থানে ফিরে আসে শুধুমাত্র তার মনিবের ফিরে আসার অপেক্ষায়। স্টেশনের গেটেই দিন কাটাতে লাগলো। স্থানীয় যারা হাচিকো এবং তার মনিবকে চিনতো তারা অনেকেই ব্যাপারটি নিয়ে বেশ কৌতুহলী ছিলেন। মুখে মুখে হাচিকোর প্রভুভক্তির খবর ছড়াতে সময় লাগে না।

১৯৩২ সালে টোকিও বেশ কয়েকটি পত্রিকা হাচিকো নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অনেকেই টোকিওর সেই ছোট্ট গ্রামে যেত শুধু হাচিকোকে দেখতে। মনিবের অপেক্ষা করতে করতেই ১৯৩৪ সালের মার্চে হাচিকো মারা যাবার আগে স্টেশনের গেটে সে কাটিয়েছিল ৯টি বছর। টোকিওর শিবুয়া স্টেশনে হাচিকো এখনও দাঁড়িয়ে আছে! তবে রক্তে মাংসের দেহে নয়, ব্রোঞ্জ মুর্তি হয়ে। প্রতি বছর ৮ই এপ্রিল হাচিকো স্মরনে শিবুয়া স্টেশনে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এখনও।
১৬/০৪/২০২২, ০১.২৫ PM
