বৃত্তবন্দী সুখ
আশ্রমের দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ পাওয়া গেলো একদিন। গেট পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল যে সন্ন্যাসীর ওপর, দরজা খুলেই তিনি দেখতে পেলেন গাঁয়ের এক লোক চমৎকার এক ছড়া আঙুর হাতে দাঁড়িয়ে আছে। গাঁয়ের লোকটি বললেন,
– আমার ক্ষেতের সবচাইতে মিষ্টি আঙুর এগুলো। আপনাকে উপহার দিতে নিয়ে এসেছি আমি।
সন্নাসী বললেন,
– অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। এক্ষুনি আশ্রম-প্রধানের কাছে নিয়ে যাচ্ছি আমি এগুলো। কী যে খুশি হবেন তিনি আঙুরগুলো পেলে।
গাঁয়ের লোকটি দ্রুত বললেন,
– না না! এগুলো কেবল আপনার জন্যই এনেছি আমি। কারণ যখনই আমি এই দরজায় কড়া নাড়ি, আপনিই সবসময় খুলে দেন। সেবার খরায় যখন আমার খেতের সব ফসল নষ্ট হয়ে গেলো, আপনি তখন রোজ আমাকে এক টুকরো রুটি আর এক গ্লাস সুরা খেতে দিতেন।
আঙুরগুলো নিলেন সেই সন্ন্যাসী, আর সারাটা সকাল ধরে মুগ্ধ হয়ে দেখলেন সেগুলো। তারপর ঠিক করলেন, আশ্রম-প্রধানের কাছেই দিয়ে আসবেন উপহারটা। এই মানুষটাই তাঁকে সবসময় জ্ঞানের কথা বলেন।
আশ্রম-প্রধান আঙুরগুলো পেয়ে দারুণ খুশি হলেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে পড়লো, আশ্রমের এক সন্ন্যাসী খুব অসুস্থ। ভাবলেন, “আঙুরগুলো তাকেই পাঠিয়ে দিই বরং আমি। কে জানে, কিছুটা হলেও তাঁর ভাল লাগবে হয়তো এই অসুস্থ শরীরে।” ঠিক তাই করলেন তিনি। কিন্তু অসুস্থ সন্ন্যাসীর ঘরেও বেশিক্ষণ রইলো না সেই উপহার। তিনি ভাবলেন, “রাঁধুনী এতদিন ধরে দেখাশোনা করছে আমার, সবচেয়ে ভাল খাবারগুলো আমাকেই খাইয়েছে। আঙুরগুলো খুব পছন্দ করবে সে।”
আরো বিদেশী গল্পের অনুবাদ পড়ুন –
- ছায়া
- নিহির
- সহানুভূতির সনদ
- অপমানের উপহার
- শয়তানের যন্ত্রপাতি
- ভাঙা হৃদয়ের সংবিধান
- অহংকার ভালোবাসা ও কথিত নৌকা
রাঁধুনী তো এত সুন্দর আঙুর দেখে অবাক! এত নিখুঁত আঙুরগুলো – আশ্রমের তত্ত্বাবধান করেন যিনি, তিনি ছাড়া আর কেউ এর উপযুক্ত কদর করতে পারবেন না। সবাই তাকে পুণ্যবান একজন মানুষ হিসেবে জানে, প্রকৃতির এই আশ্চর্য উপহার তাকেই মানায়। তত্ত্বাবধায়ক আঙুরগুলো হাতে পেয়ে, আশ্রমের সবচেয়ে অল্পবয়সী ছাত্রকে দিয়ে দিলেন সেগুলো। সবচেয়ে ছোট্ট সৃষ্টিগুলোতেও স্রষ্টার কারুকাজ যে কতটা নিখুঁত – তা যেন সে বুঝতে পারে।
উপহার পেয়ে ছাত্রের সেই মানুষটাকে মনে পড়লো, প্রথম যেদিন এই আশ্রমে এসেছিল সে, যিনি সেদিন দরজা খুলে দিয়েছিলেন। সেদিন তিনি তাকে এখানে ঢুকিয়েছিলেন বলেই তো আজ এমন সব মানুষদের মাঝে আছে সে, যাঁরা জানেন জীবনের খুঁটিনাটি সৌন্দর্যগুলোর মূল্য কেমন করে দিতে হয়। আর তাই, রাত নামার ঠিক আগ দিয়ে, আঙুরগুলো দরজার পাহারায় থাকা সেই সন্ন্যাসীর কাছে নিয়ে গেলো সে।
– এই আঙুরগুলো খেয়ে নিন। বেশিরভাগ সময়ে একলাই থাকেন আপনি এখানে। খুব ভাল লাগবে আপনার এগুলো খেলে।
সন্ন্যাসী বুঝতে পারলেন, আঙুরগুলো আসলে তার ভাগ্যেই ছিল। তারপর সবগুলো আঙুর খেয়ে, সুন্দর সুখের এক ঘুমের রাজ্যে ডুবে গেলেন তিনি। এভাবেই বৃত্তটা পূর্ণ হল; সুখ আর আনন্দের সেই বৃত্ত, ভালো মানুষদের মাঝে যা অবিরাম দীপ্তি ছড়িয়ে যায়।
১৬/০৪/২০২২, ১২.৫৫ PM
[অনুবাদ গল্প, মূল লেখক – পাওলো কোয়েলহো]
