কন্যা সর্বনাশী (শেষ পর্ব)
[২৪]
আজ আবির নীলার বিয়ের দিন। নীলা আবিরের ঘরে বউ সাজে পা তুলে বিছানায় বসে আছে। সে এই ঘরটায় আগে যখন এসেছিল সেদিন ঘরটা দেখতে কেমন তা দেখার সুযোগ পায়নি। তাই আজ ঘরটা ভালো করে দেখছে। ঘরটা বেশ বড়। একটা টেবিল আছে তার উপর ডেক্সটপ, টেবিলের পাশে হোম থিয়েটার, একটা আলমিরা আছে, একটা ছোট বুক শেল্ফ আছে যেটা বইয়ে ঠাসা, এক কোনায় একটা গিটার আছে, দেয়ালে বেশ কিছু পেইন্টিং ঝুলছে, আর আছে একটা বেড, যার উপর নীলা বসে আছে, তাও আবার সিঙ্গেল বেড। এত দিন একা ছিল এটাই নাহয় ঠিক ছিল তাই বলে এখনও এই সিঙ্গেল বেড থাকবে? এটা বোকামি তো হতেই পারে না নিশ্চই আবিরের বদমাইশি। এই সিঙ্গেল বেডে দুজন মানুষ একসাথে ঘুমাবে কি করে? তখন আবির ঘরে ঢুকল। নীলার পাশে বসে বলল,
– আমার ঘরটা দখল করতে পেরে কেমন লাগছে এখন?
– আর কেউ একজন যে আমাকে এই ঘরের বাসিন্দা বানাতে জগত সংসার পাল্টে দিয়েছিল তার কি?
– জগত সংসার তো আরও একজন পাল্টে দিয়েছে আর সে শুধু সেটা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি সাথে আমার কোনদিন কারো সাথে শেয়ার না করা ঘরটাও একেবারে দখল করে নিয়েছে।
– হুম, একেই বলে পাওয়ার, বুঝলে? তার আগে বল তুমি বিছানাটা কেন বদলাওনি?
– বিছানা কেন বদলাব? আজব! এই বিছানা আমার ভালোবাসা, একে ছাড়া আমার ঘুম হয় না। এটা বদলাবার তো প্রশ্নই আসে না।
– আমার কিন্তু ঘুমের মাঝে হাত পা ছোড়ার অভ্যাস আছে। তুমিই ঘুমাতে পারবে না পরে।
– ঘুমাতে চাইছে কে? কত রাত আমার নির্ঘুম কাটাবার কারণ ছিলে তুমি সেটা এখন পরিশোধ করবার পালা। আর ঘুমালেও ঘুমাবে তো আমার হাতের ভেতর হাত পা ছুড়তে দিলে তো?
– ইসস আসছে হিসাব ওয়ালা। এই ঘরের মালিক এখন আমি। আর আমি যা বলব তাই হবে।
– আর আমি মালিকানা ছেড়ে দিয়েছি নাকি? আমি শুধু এই ঘরের না এ বাড়ির বউটারও মালিক। আমার সাথে হিসেব করে কথা বলবে।
– তাই না? দেখা যাবে কে কত হিসেব করে। শোনো, আমি এখন চেঞ্জ করতে চাই।
– এখানেই? করো, আই ডোন্ট মাইন্ড।
– হ্যাঁ এখানেই চেঞ্জ করব তবে তুমি ঘর থেকে বাইরে যাবার পর। যাও বের হও।
– প্রথম দিন এসেই আমাকে আমার ঘর থেকে বের করে দিচ্ছ! এত সাহস কোথায় পাও?
– এমনিতেই আমার সাহস একটু বেশি। তার উপর এখন বিয়ে হয়েছে, জামাই আছে, তাই ডাবল সাহস পয়দা হয়েছে।
– ঠিক আছে আমি বের হচ্ছি না, বসে থেকে তোমার সাহস এঞ্জয় করি একটু।
– ওরে পাজি বের হও তো। না হলে ঠেলে বের করে দেব।
– বাসর ঘর থেকে বের করে দেয়ার মত নিষ্ঠুর রমণী আগে দেখিনি।
– ও হ্যালো, এই এক পিসই দেখবে। এখন যাও তবে যাবার আগে আমার চুলটা একটু খুলে দাও। যা তা করে আটকে দিয়েছে আমি একা খুলতে পারব না।
– শুধু চুল? আর কিছু খোলার সুযোগ পাব না?
– একদম অসভ্যতা করবে না বলে দিলাম।
– হুম, কিছুই করতে দিচ্ছে না। তাহলে আর এঘরে থেকে করবই কি? বের হয়ে যাওয়াই ভালো মনে হচ্ছে এখন।
এই লেখিকার অন্যান্য লেখা –
[২৫]
নীলা ফ্রেস হয়ে আসলে আবির নীলাকে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল। এক ফালি চাঁদ তখনও আকাশে জ্বল জ্বল করে জ্বলছিল। ল্যাম্পপোস্ট আর চাঁদের আলো আধারিতে নীলাকে মনে হচ্ছিল অন্য কোন ভূবন থেকে আসা। মায়াবী এই কন্যা যেন আবিরের জীবনে হুট করে এসেছে তাকে লুট করে নিয়ে যাবার জন্য। নীলার দিকে তাকিয়ে ওর হাত ধরে আবির বলল,
– সবটা স্বপ্ন লাগছে আমার কাছে। মনে হচ্ছে ঘুম ভাঙলেই তুমি নাই হয়ে যাবে। তুমি কি সত্যিই আমার ঘরে?
– জ্বী জনাব।
– তোমাকে ছাড়া আমি শেষ হয়ে যেতাম। আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য তোমাকে আজীবন ভালোবাসা। পারবে তো আমার পাশে এভাবেই ভালোবেসে থাকতে?
নীলা আবিরের হাত তার দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
– প্রাণের বাঁধন দিয়েছি প্রাণেতে দেখি কে খুলিতে পারে।
– একটা কাজ করতে পারবে?
– কী?
– আমার গিটারটা নিয়ে এসো।
গিটার এনে আবিরের হাতে দিয়ে বলল,
– তুমি গান জানো? আমি তো জানি না সেটা!
– সবে তো এলে আস্তে আস্তে অনেক কিছুই জানতে পারবে।
আবির গান ধরল।
“আমার ভিতরও বাহিরে অন্তরে অন্তরে,
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে…।”
আবিরের কাঁধে মাথা রেখে নীলা মুগ্ধ হয়ে গান শুনল। বলল,
– তুমি এত ভালো গাও!
আবির হাসল। গল্প আর গানে গানে প্রায় পুরো রাত পার করে দিল তারা। ফজরের আযান হতে আর বেশি বাকি নেই। দুজন একসাথে নামাজ পড়ে নিল। আবির বলল,
– তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। তোমার চেহারায় যদি ঘুম না হবার চিত্র ভেসে থাকে তাহলে কাল সবাই আমাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জবাবদিহি করবে।
– দেবে জবাব।
– তাই না? ঠিক আছে বলব “তুমি সারা রাত আমায় জাগিয়ে রেখেছ।”
– তুমি এত অসভ্য কেন?
– এই অসভ্য ছেলেটার জন্যই তো তুমি পাগল হয়ে গিয়েছিলে। আর তোমার সাথে অসভ্যতা করব না তো কি পাশের বাসার আন্টির মেয়ের সাথে করব?
– পাশের বাসা পর্যন্ত যাও না মেরে নাক ভেঙে দিব। আচ্ছা আমি তো এখানে ঘুমাব তুমি কোথায় ঘুমাবে?
– “তুমি কোথায় ঘুমাবে” মানে? আমার বিছানা আমি তো এখানেই ঘুমাব। আর তুমি আমার পাশে এডজাস্ট করবে।
নীলা তখন দৌড়ে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে বলল,
– তুমি এখন কি করবে করো।
আবির গিয়ে বিছানায় উঠে পেছন থেকে নীলাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে বলল,
– সিঙ্গেল বেডটা কি এমনি এমনি রেখেছি? তোমাকে আর এতটুকু দূরে থাকতে দেব না।
বাকি সময়টাও তাদের খুনসুটি করেই কেটে গেল। সকালের দিকে আবির ঘুমিয়ে গিয়েছিল। নীলা সেই মুখটার দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এই মানুষটা তার, একান্তই তার নিজের। এই মানুষটাকে সে কখনো কষ্ট পেতে দেবে না। প্রাণ দিয়ে আগলে রাখবে। নীলা উঠে ফ্রেস হয়ে বসে থাকে। সারা রাত জাগার কারণে মাথায় কেমন ভোতা যন্ত্রণা হচ্ছে তার। এক কাপ চা পেলে খুব ভালো হত। আবির তখনও ঘুমাচ্ছে। একটু পর আবিরের মা ডাকলেন আবিরের নাম ধরে। নীলা দরজা খুলে বলল,
– মা আপনার ছেলে তো এখনো ঘুমাচ্ছে।
– ও, আবিরকে ডেকে তোলো আমি চা পাঠিয়ে দেই?
– মা, চা’টা আমি বানাই?
– সে কি! প্রথম দিনেই তুমি রান্নাঘরে যাবে? আমাকে দজ্জাল শ্বাশুড়ি বানাতে চাও নাকি?
– তা নয় মা।
নীলা মুখ নিচু করে রইল।
– নতুন বউয়ের হাতের মেহেদী না ওঠা পর্যন্ত রান্নাঘরে যেতে নেই। তবু তুমি যখন চাইছ এবেলার চা করতে দিচ্ছি। চলো।
নীলা চা করে শ্বশুর শ্বাশুড়িকে দিয়ে নিজের আর আবিরের জন্য নিয়ে তার ঘরে চলে গেল। আবির তখনও ঘুমাচ্ছিল। নীলা চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে আবিরের কানের কাছে তার হাত নিয়ে চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ করল। আবির চোখ মেলতেই নীলার মিষ্টি মুখটা দেখল। দিনের শুরুটা তার সুন্দর করে শুরু হল। মনে মনে বলল “তার প্রতিটা দিন এভাবেই আসুক”।
এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-১)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-২)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৩)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৪)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৫)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৬)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৭)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৮)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৯)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-১০)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-১১)
[২৬]
আবিরের জীবন এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। নীলা তার জীবনে বন্ধঘরে দখিনের খোলা জানালা হয়ে এসেছে। যে জানালা থেকে প্রতি মুহূর্ত শীতল বাতাস এসে আবিরকে শীতল করে দেয়। মন চাইলেই জানালার বাইরের বিশাল আকাশটাতে উড়ে বেড়ানো যায়। এখন ওর এলোমেলো ঘরটা সব সময় গোছানো থাকে। আগে অফিসে যাবার আগে এটা ওটার জন্য আম্মুকে ডাকতে হত। এখন নীলা সব এগিয়ে গুছিয়ে রাখে। নীলার চোখে মুখে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছাড়া অন্য কিছু কখনো দেখতে পায়না আবির। কখনো কখনো ঘর এলোমেলো করে নীলার সাথে ইচ্ছে করে ঝগড়া বাধায়।
নীলা যখন কাজে ব্যস্ত থাকে তখন তাকে বিরক্ত করাটা আবিরের প্রিয় অভ্যাস। রাত হলে হুটহাট বারান্দা বা ছাদে বসে চা খেতে খেতে দুজন গান করে। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে বুকের ভেতর গুঁজে থাকা নীলার মুখটা দেখতে ভালো লাগে। হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছে হয় তখন। জীবনটাকে সহজ মনে হয়, সুন্দর মনে হয়। ইচ্ছে করে এই শহরের প্রতিটি বিলবোর্ডে নীলার নামে দু’লাইন ভালোবাসা উৎসর্গ করে দেয়। জীবন চলুক না এমনই নদীর মতন।
[সমাপ্ত]
১০/০৬/২০২২, ০৯.০০ AM
