গল্পসাপ্তাহিক সংকলন

কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৬)

[১১]

আবির আর নীলা সামনাসামনি বসে আছে। আবিরকে নিয়ে নীলার মনে জমে থাকা প্রশ্নগুলো প্রবল বর্ষণের মত আছড়ে পড়তে চাইছিল। কিন্তু কী বলবে, কীভাবে বলবে এসব নিয়ে সে অপ্রস্তুত। ওদিকে আবির শান্ত নদীর মত বসে আছে। যেন প্রতিনিয়তই তাদের দেখা হয়! আবিরই প্রথম মুখ খুলল। বলল,

– কই, কেমন আছ বললে না তো?

– ভালো আছি। আপনি?

– ভালো। তোমাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেদিন তুমি নীল শাড়ী পরে ছিলে, আজও তাই। মনে হচ্ছে নীল রংটা যেন তোমার জন্যই তৈরি।

নীলা মিষ্টি করে একটা হাসি দিয়ে বলল,

– আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?

– কেন? তুমি কী আমার খোঁজ করেছিলে?

নীলা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। বলল,

– না মানে, আপনি এমন করে উধাও হয়ে গেলেন। চেনা-জানা কেউ হারিয়ে গেলে তার জন্য প্রশ্ন তো আসেই।

– ও… হারিয়ে যাইনি। বাঘ যেমন শিকার ধরার জন্য প্রথমে কয়েক পা পিছিয়ে যায় তারপর মোক্ষম সময় দেখে ফিরে আসে আমিও তাই করেছি। তবে পার্থক্য এই যে, বাঘ শিকার ধরার জন্য এমন করে আর আমি কাউকে নিজের করে পাবো বলে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে আড়ালে চলে গিয়েছিলাম। আমি ফিরে এসেছি এমনভাবে যেভাবে এলে কেউ আমায় ফেরাতে পারবে না।

– আমার ভাইয়া কী জানে আপনি কে?

– জানে। আমি তাকে আমার গল্পের সবটা জানিয়েছি। এক মাস আগে তোমার ভাইয়ার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, সেদিনই সবটা বলেছি। সেদিন সে কিছু বলেনি। শুধু বলেছিল “ঠিক আছে দেখছি। আমি তোমাকে পরে জানাচ্ছি কী করতে হবে।” এর এক মাস পর ৪দিন আগে ভাইয়া আমাকে ফোন করে ডাকিয়ে নেয়। তারপর বললেন- “সরি তোমাকে দীর্ঘদিন কিছু না বলতে পারার জন্য। তুমি যখন আমার কাছে এসে নিজের সবটা খুলে বলেছিলে তোমার প্রতি আমার কোনো অবিশ্বাস জন্মায়নি। তবু আমার একমাত্র বোনের ব্যাপার তাই আমাকে নিশ্চিন্ত হবার জন্য কিছুটা সময় নিতে হল। এই এক মাস আমি তোমার পেছনে দুজন লোক লাগিয়েছিলাম। তুমি কী করো না করো সব ডিটেলস জানার প্রয়োজন ছিল আমার। জনো তো পুলিশের চোখকে কখনো ফাঁকি দেয়া যায় না। এই একমাসে এমন কিছু পাওয়া যায়নি যা থেকে তোমার চরিত্রে এতটুকু দাগ পাওয়া যায়। আমার ধারণা আমার বোনের জন্য যে নিজেকে এতটা সংশোধন করতে পারে সে নিশ্চই আমার বোনকে অনেক ভালো রাখবে। নীলাকে আমি তোমার সামনে নিয়ে আসব। তোমরা নিজেরাই ঠিক করবে তোমাদের করণীয় কী? আমি তোমাদের পাশে থাকব। তবে কাউকে জোর করব না।” তারপর কাল ফোন করে বললেন তুমি দেখা করতে আসবে। এখন আমরা মুখোমুখি বসে।

– ভাইয়াকে আপনি সব বলতে কতটা বলেছেন?


এই লেখিকার অন্যান্য লেখা –


– সব মানে সব বলেছি। আমার বাউন্ডুলে লাইফ থেকে শুরু করে সব। কারণ আমি জানি তিনি পুলিশ অফিসার তার কাছে কোনো কিছু গোপন করার উপায় নেই। সেটা হিতে বিপরীত হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা কী জানো যাকে নিজের ভাবা যায় তার কাছের লোকেরাও নিজের হয়ে যায়। নিজের লোকের কাছে লুকোবার কিছু থাকে না। আমি নিজেকে আঁড়ালে রেখেছিলাম ঠিকই কিন্তু তোমার প্রতিটা পদক্ষেপ আমার নখদর্পণে ছিল।

– এভাবে আঁড়ালে থাকাটা কী খুব জরুরী ছিল?

– ছিল। আঁড়াল করার পর তুমি আমাকে যতটা সিরিয়াসলি নিয়েছ আঁড়ালে না গেলে ততটা নিতে না। আর তাছাড়া…।

– তাছাড়া?

– আমি নিজেকে তোমার জন্য প্রস্তুত করতে চাইছিলাম। সে কারণেও সব কিছু থেকে দূরে থাকাটা দরকার ছিল। আমি সম্পূর্ণ নিজের জগত তৈরি করে নিয়েছিলাম যেখানে শুধু নিজের পরিবার আর তুমি ছিলে। নিজেকে যোগ্য আর সব কিছু থেকে দূরে রাখতে রাতদিন এক করে পড়তাম শুধু। তাই ভালো রেজাল্ট করে বের হয়েছিলাম। চাকরিটা পেতেও খুব বেশি স্ট্রাগল করতে হয়নি। অবশ্য আমি চাইলেই বাবার বিজনেসে জয়েন করতে পারতাম কিন্তু সেটা তো নিজের যোগ্যতা বলে কিছু হত না। তাই চাকরির চেষ্টা করলাম। চাকরি হবার পর নিজেকে গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় নিলাম। তাতে ৬মাস চোখের পলকে চলে গেল যেন। তারপর তোমার ভাইয়ার সাথে দেখা করে সব বললাম। এখন বাকিটা তুমি বলবে। নীলা নামক গল্পটাতে আবির নামটা যুক্ত হবে কী না? আবিরের গল্পে কোনো পরিণতি আসবে কিনা?

– আবির ভাই গত দুই বছর ধরে আমার জন্য পাত্র দেখা হয়েছে। অনেক ভালো ভালো পাত্র এসেছে। আপনার উধাও হবার চক্করে আমার যদি বিয়ে হয়ে যেত তখন?

– হত না। ওই যে বললাম তোমার সব কিছু আমার নখদর্পণে ছিল? তোমার জন্য কতগুলো পাত্র দেখা হয়েছে তার সবই আমি জানি। একটা একটা করে বিয়ে গুলো ভেঙেছে কে বলো?

– আপনি এসবও করেছেন? কি সাংঘাতিক ছেলে!

– কি করব বলো সাংঘাতিক একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম যে। তবে তুমিও যে আমার টুকটাক খোঁজ করেছ, মিস করেছ সে হিসেব রাখতেও বাদ রাখিনি।

– তাহলে কোন যোগাযোগ কেন করেননি?

– আজকের দিনটা সেই সাথে আজকের পরের প্রতিটা দিন যেন সুন্দর হয় সেই আশায়। আচ্ছা আমরা এত কথা খালি মুখে কেন বলছি? তোমাকে এখনো খাবার অফার না করাটা চূড়ান্ত অভদ্রতা হয়ে গেল। কী খাবে ঝটপট বলে ফেল। টেবিলটা বুকিং দিয়ে নিয়েছি খেতে খেতে গল্প করা যাবে। অনেক বছরের, অনেক দিনের, অনেক গল্প জমা আছে।

– আমাকেই খাবার অর্ডার করতে হবে?

– হ্যাঁ, কারণ আজ তুমি আমার অতিথি।

নীলা মেন্যুবুকটা ওপেন করে বলল,

– আবির ভাই, এরপর থেকে দুজন মিলে অর্ডার করব, মনে থাকবে?

আবিরের হার্টবিট যেন থেমে যেতে চাইল। যেন হাজার বছরের তৃষ্ণা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল এক পশলা ঝুম বৃষ্টিতে। সে নীলার দিকে গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওর ভেতরটা পড়ে নিল। তারপর বলল,

– কে আবির ভাই? আমি ওসব ভাই টাইকে চিনি না।

– এখনো ফ্ল্যার্ট করা ছাড়তে পারলেন না?

– তুমিও তো “ভাই” বলা ছাড়তে পারছ না।

– চেষ্টা করব, সময় লাগবে একটু।

– অর্ডার করবে না কী খিদে পেটে বসে থাকব?


এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –


নীলা অর্ডার করল। তারপর দুজনে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করল। নীলার ভাবি এর মাঝে একবার ফোন করে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা জানতে চাইল। প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,

– তুই কী এখনো রেস্টুরেন্টে বসে আছিস?

– হ্যাঁ।

– এখনো! বাড়ি ফিরবি না না কী? না কী আজই কাজী ডেকে ফেলব?

– উফফ ভাবি তুমি থামবে?

আবির সামনে বসা মন খুলে কিছু বলতেও পারছিল না। ওদিকে এই সুযোগটা ভাবি নিচ্ছিল। নীলা বলল,

– তুমি ফোন রাখবে? কথা বলতে দিচ্ছ না কিন্তু।

– ও বাবা এখনই এই অবস্থা! ছেলেকে দেখেই আমাদের ভুলে গেলি। বাকি জীবন কী করবি?

– বাকি জীবন কী করব জানি না কিন্তু তুমি এখন ফোন না রাখলে ভাইয়ার কাছে তোমার নামে মিথ্যে নালিশ করব আর বাড়ি এসে আজকের কথা কিচ্ছু বলব না।

নীলার ভাবি কপট রাগ দেখিয়ে ফোন রেখে দেয়। নীলা একটু অপ্রস্তুত হয়ে আবিরকে বলল,

– ইয়ে… ভাবি ফোন করেছিল। ফোন দিয়েই ফাজলামো শুরু করে দিয়েছে।

আবির হেসে ফেলল। হুম, বুঝতে পারছিলাম। ঠিকই আছে। তুমি কী ভেবেছ এই যে এতগুলো দিন আমাকে একা যাপন করতে হয়েছে ভাবির সাথে মিলে আমি তার শোধ নেব না?

– ও, আমার ভাবির সাথে মিলে আমার বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র! শুনুন আপনারা যেমন বুনো ওল হবেন আমিও তেমনি বাঘা তেতুল হব।

– ওয়াও, আই লাইক বাঘা তেতুল।

তারপর আরও কিছুক্ষণ তারা গল্প করল। দুজনের কারোরই উঠতে মন চাইছিল না। নীলা বলল,

– এত বড় বক্সে কী আছে?

– বাসায় গিয়ে খুলে দেখবে।

– আচ্ছা চলুন অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি ফিরতে হবে।

– চলো তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসি। আর হ্যাঁ, মা বাবাকে তোমার বাসায় কবে পাঠাব?

নীলা খানিকটা লজ্জা পেল। বলল,

– সে ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন।

– ঠিক আছে। আর আমাদের আবার কবে দেখা হবে?

– সব কথা এখনই বলে ফেলব? পরের জন্য কিছুই কী বাকি রাখব না?

– ঠিক আছে। ফোন করব আমি।

[১২]

নীলার মনে আজ অদ্ভুত সব রংবেরঙ এর অনুভূতি প্রজাপতির মত এসে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। যে অনুভূতি সে এক কথায় প্রকাশ করতে পারে না। আজ তার সব কিছুই যেন ভালো লাগছে। এই শহর, এই পথ, পথের যানজট, এই রিকশা, বাতাসে তার চুলে হালকা দোলা দিয়ে যাওয়া, হেঁটে যাওয়া ব্যস্ত মানুষ। সবই তাকে আনন্দ দিচ্ছে! তার অবাক লাগছে এই আনন্দের উৎস শুধুই আবির। তার জীবনের অমীমাংসিত অধ্যায়টা কী তবে মিলে যেতে বসেছে?

আজ এতগুলো দিন পর হঠাৎ করে এসে আবির টুপ করে তাকে এভাবে দখল করে নেবে নীলা কী তা আদৌ ভেবেছিল কোনদিন? তার ভাবনার জগতটা আবির কেমন সহজেই বন্দি করে নিল। তবে কী মনের অজান্তেই তার মনে আবিরের বসতি ছিল? বুকের গহীনে জমে থাকা অস্পষ্ট অন্ধকারে আবির খুব সহজেই যেন জ্বেলে দিল নরম আলো। জীবন বড়ো অদ্ভুত। ভাসতে ভাসতে কোথায় গিয়ে আটকে যায় কেউ বলতে পারে না।

[চলবে]

২১/০৫/২০২২, ০৯.০০ AM

Shamima Zaman

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তৃষ্ণা হলো তার সাথে কথা বলার তৃষ্ণা। কথা আর হয় কই! আমার নৈশব্ধময় সকাল-দুপুর-বিকেল শব্দময় হয়ে রয়, মোবাইলের স্ক্রীনে, কালো অক্ষরে। আমি সেসব নিয়ে ব্লগে অক্ষরের মেলা সাজালাম। একটি করে দিন যায় আর মৃত্যুর দিকে আরও একটি দিন এগিয়ে যাই। হিসেবের খাতায় কী জমা হচ্ছে জানি না। আল্লাহর কাছে শুধু এটুকুই প্রার্থনা ভালো কিছু জমা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *