কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-১০)
[১৯]
আবিরকে পুরো এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। এক্সিডেন্টে সে মারাত্মক ভাবে আহত হয়েছিল। শরীরের অনেক জায়গায় কেটে গেছে, থেঁতলে গেছে। সেগুলো এখনো পুরো সারেনি, সময় লাগবে। তবে মূল আঘাতটা পেয়েছে বাম পায়ে। দুই জায়াগায় ফ্রাকচার হয়েছে। ফ্রাকচারের কারণে তার নার্ভ ড্যামেজ হয়ে গেছে। ফ্রাকচার ঠিক হতে দুই মাস সময় লাগবে। তবে দু’মাস পরেই যে আবির নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে তা নয়। নার্ভ ড্যামেজের কারণে ডাক্তার আশংকা করছেন আবিরকে হয়ত সারা জীবন স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটতে হবে!
এই এক সপ্তাহ নীলা সারাদিন হাসপাতালে থেকেছে, আবিরের পাশে। রাতে ঠিক মত ঘুমায়নি। তার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আবির ভেতর থেকে একেবারে ভেঙে পড়েছে। নীলা সার্বক্ষণিক আবিরের মনে সাহস জোগাবার চেষ্টা করেছে। নীলা না দেখালেও তার হাসিখুশি মাখা মিষ্টি মুখটায় ক্লান্তি আর আতংকের ছাপ ঠিকই দেখতে পেত আবির। সব কিছু ছাপিয়ে নীলার মলিন চেহারায় তার জন্য কী আশ্চর্য এক ভালোবাসাও ভরে থাকত।
এক্সিডেন্টের কারণে ওদের বিয়েটা পিছিয়ে গেল। যদিও নীলা চাচ্ছিল নির্ধারিত সময়ে হয়ে যাক। কারণ আবিরের এখন নীলাকে বিশেষ ভাবে পাশে প্রয়োজন। কিন্তু বাড়ির বড়দের সেটা বোঝানো গেল না। তারা চাইল বিয়েটা পিছিয়েই যাক। আড়াই মাস পর আবিরের পায়ের প্লাস্টার খোলা হল। তার পায়ের ফ্র্যাকচার ঠিক হলেও সে নিজের পায়ে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না! আবির ভেতর থেকে একেবারে ভেঙে পড়ল। পায়ের সাথে সাথে তার জীবনটাও হয়ত এখন খোঁড়া হয়ে যাবে। সবাই হয়ত এখন তাকে করুণার চোখে দেখবে। সে আদৌ কী আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে?
নীলার আবিরের কাছে যাওয়াটা নীলার মা আর পছন্দ করছিলেন না। তিনি মন থেকে চাইছিলেন এই বিয়েটা আর না হোক। এতে সবাই তাকে খারাপ ভাবে ভাবুক তার কিছু যায় আসে না। নীলার মত এমন মেয়ের পাশে একটি পঙ্গু ছেলেকে তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। নীলার বাবা আর ভাইয়া এ ব্যাপারে কিছু বলছেন না। তারা চাইছেন নীলা বুঝে শুনে একটা সিদ্ধান্তে আসুক। সে বুদ্ধিমতী মেয়ে, নিশ্চই ভুল সিদ্ধান্ত নেবে না। নীলা যে সিদ্ধান্ত নেবে তারা সেটাকেই সাপোর্ট করবে।
ওদিকে আবির এখন একা থাকতেই বেশি পছন্দ করে। কারো সাথে তেমন কথা বলতে চায় না। নীলার সাথেও না। সবার থেকে দূরে থাকার অদৃশ্য দেয়াল তার চারপাশে তুলে দিচ্ছে সে ধীরে ধীরে। আগের মত প্রাণ নেই ছেলেটার চেহারায়। আবিরের মা ছেলেকে এমন দেখে নিজেও ভেঙে যাচ্ছেন। তিনি চাইছিলেন বিয়েটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাক। নীলা এসে ঠিক আবিরকে সামলে নেবে। এই আশাতে সে নীলার মায়ের সাথে কথা বলতে গিয়েছিল। কিন্তু নীলার মায়ের কথাগুলো যেন কেমন ছিল, তার ভালো লাগেনি। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, নীলার মা এভাবে কেন কথা বলছেন। এই বিষয়ে আবিরের বাবার সাথে শেয়ার করলে তিনি বুঝলেন নীলার মা কি চাইছেন। তারপরও ছেলের কথা ভেবে তিনি বললেন,
– চলো নীলাদের বাড়ি গিয়ে একবার কথা বলে দেখি তারা কী বলেন?
ওরা সিদ্ধান্ত নিলেন, আবিরকে কিছু না জানিয়ে নীলাদের বাড়ি যাবেন বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে। পরদিন আবিরের মা বাবা দুজন নীলাদের বাড়ি গেল। নীলাদের বাড়ির কারোর চেহারায় আজ কেমন যেন প্রাণচঞ্চলতা নেই। মেঘে ঢাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। কুশল বিনিময়ের পর আবিরের মা বললেন,
– আমরা আসলে বিয়ের ব্যাপারে কথা আগাতে চাইছিলাম। বিয়েটা তো অনেকদিন হল পিছিয়ে গেছে। আবির এখন মোটামুটি সুস্থ। কিন্তু মনের দিক থেকে আমার ছেলেটা একদম ভেঙে পড়েছে। এই সময়ে নীলা ওর পাশে থাকলে খুব ভালো হত। বিয়ের তারিখটা কি নির্ধারন করা যায় না?
এই লেখিকার অন্যান্য লেখা –
নীলার বাবা বললেন,
– আসলে এ বিষয়ে আমরা তো এখনো কোনো আলাপ করিনি।
আবিরের বাবা বলল,
– আলাপ করতেই তো এলাম।
নীলার মা বললেন,
– দেখুন আমি এত ভণিতায় যেতে চাই না। সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করি। আমার মেয়েটা সব দিক থেকে ভালো। তাই ওর জন্য পাত্র হিসেবেও সব দিক থেকে ভালো ছেলে চাই আমরা। আমি চাই না আমার মেয়ে সারা জীবন কষ্টে থাকুক।
আবিরের মা বললেন,
– কষ্টে কেন থাকবে? আবির যেমন আমার সন্তান নীলাও তো আমার কাছে তেমনই।
– এটা হয় না। পরিবার সব সুখ দেয় না। জীবনসঙ্গী যদি পার্ফেক্ট না হয় তাহলে কী ভালো থাকা যায়?
– আমার ছেলেটা একটা এক্সিডেন্ট করেছে এখন সবার উচিৎ তার পাশে থাকা। আপনারা যদি এভাবে বলেন তাহলে আমার ছেলেটা শেষ হয়ে যাবে। ও নীলার জন্য কী না করেছে? নিজেকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছে তার কোন মূল্যই কি নেই?
নীলার মা বলল,
– দেখুন এসব ইমোশনাল কথা দিয়ে তো আর জীবন চলে না। জীবন চলে বাস্তবতায়।
আবিরের মা বুঝল এখানে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তবু জিজ্ঞেস করলেন,
– নীলা মায়েরও কী একই কথা?
– হ্যাঁ। আমাদের মেয়েকে আমরা যা বলব সে তাই করবে।
আবিরের বাবা বলল,
– আমি নীলা মায়ের সাথে একটু কথা বলতে চাই।
নীলার মা বললেন,
– আমার মেয়েটা সরল তাই ওর সাথে কথা বলে ওকে ইমোশনাল করে ফেলবেন। ওর মাইন্ড ঘোরাবার চেষ্টা করবেন সেটা আমি চাই না।
আবিরের মা বাবা আর কোন কথা বললেন না। তারা চলে গেলেন। তারা চলে যাবার পরই নীলা ঘরে ঢুকল। সে এতক্ষণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সবটা শুনেছে। তার মা যে এভাবে ভাবতে পারে সেটা সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। সে ঘরে ঢুকে সরাসরি মাকে জিজ্ঞেস করল,
– মা এটা তুমি কি করলে? কেন তাদের সাথে এমন আচরণ করলে, কেন এভাবে বললে?
– যা ঠিক মনে হয়েছে আমি তাই বলেছি। তুমি এটা নিয়ে কোন কথা বলবে না। আমরা যা সিদ্ধান্ত নেব তাই হবে।
– তুমি সিদ্ধান্ত নিলে তো হবে না মা। আর যেখানে বিয়ে পাকা হয়ে গেছে আংটি বদল হয়ে গেছে সেখানে তুমি এসব ভাবছ কি করে?
– ভাবছি কারণ কোন পঙ্গু ছেলের সাথে বিয়ে হয়ে আমার মেয়েটা সারা জীবন কষ্ট করুক সেটা আমি চাই না।
– মা! তুমি এভাবে বলছ? আবির আমার জন্য কি না করেছে আর এখন একটা ছোট্ট এক্সিডেন্ট তার জীবনের সব কেড়ে নেবে? এটা তো হয় না মা।
– তুমি এত বেশি কথা কেন বলছ? আমি যা বলেছি তাই হবে। আমি তোমার মা, নিশ্চই তোমার খারাপ চাইব না? যাও নিজের ঘরে যাও। এ ব্যাপারে আমি আর কোন কথা শুনতে চাই না।
নীলা আর কিছু না বলে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে কাঁদতে লাগল। আবিরকে তো সে ভালোবেসে ফেলেছে। আর আজ তার ভালোবাসার মানুষটা যখন জীবনের শ্রেষ্ঠ খারাপ সময় পার করছে তখন সে তার পাশে থাকবে না?
নীলার খুব অসহায় লাগল নিজেকে। নীলার প্রতি আবিরের তীব্র ভালোবাসার কিছুই কি সে ফিরিয়ে দিতে পারবে না? ভালোবাসার বদলে তো ভালোবাসাই দিতে হয়। তবে তার সে অধিকার কেন কেড়ে নিতে চাইছে সবাই? বিশ্বাসঘাতক প্রেমিকা হয়ে পৃথিবীর বুকে কীভাবে বেঁচে থাকবে নীলা? এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। কী করবে এখন সে?
এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-১)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-২)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৩)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৪)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৫)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৬)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৭)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৮)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-৯)
- কন্যা সর্বনাশী (পর্ব-১১)
- কন্যা সর্বনাশী (শেষ পর্ব)
[২০]
নীলার ভাইয়া বাসায় এসে রাতে খেতে বসে দেখে নীলা নেই। নীলা কোথায় জানতে চাইলে তার বউ বলল,
– নীলার মন ভালো নেই সে খাবে না বলেছে।
– মন ভালো নেই? কী হয়েছে?
নীলার মা নিজেই তখন সবটা খুলে বললেন। সরফরাজ বললেন,
– মা তুমি এগুলো কী করেছ? তাদের সাথে এভাবে কথা বলে ঠিক করোনি। নীলার উপর কী প্রেশার যাবে বুঝতে পারছ? নীলার সাথে আগে কথা তো বলে নেবে?
– নীলা আবেগী অবস্থায় আছে তার সাথে এখন কথা বলার কোন মানেই হয় না। এখন সে আবির ছাড়া কিছুই বুঝবে না।
– আমি নীলার সাথে কথা বলব। নীলা যা করতে চাইবে আমি তার সাথে একমত থাকব। ও যদি আবিরকে চায় তো তাই হবে।
– এসব তুই কি বলছিস?
– ঠিকই বলছি মা। আচ্ছা এই এক্সিডেন্টটা যদি বিয়ের পর হত তখন কি করতে? নীলা কি পারত তখন ওকে ফেলে আসতে? নাকি তোমরা পারতে নীলাকে আবিরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে?
– যেটা হয়নি সেটা নিয়ে কেন কথা বলছিস? কি হতে পারত কি পারত না সেটা আমি জানতে চাই না। যেটা হয়েছে সেটাই দেখার বিষয় এখন।
– আমি তোমার সাথে একমত হতে পারছি না। আমি চাই না আমার বোন সারা জীবন আত্মগ্লানি নিয়ে বাঁচুক। আমি নীলার সাথে কথা বলছি।
সরফরাজ তার মাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নীলার ঘরে চলে যায়। লাইট নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে কাঁদছিল নীলা। সরফরাজ ঘুরে ঢুকে বলল,
– নীলা ঘুমিয়ে গেছিস?
– না ভাইয়া।
– তোর সাথে একটু কথা বলতাম, বাতি জ্বালাই?
– আমার কিছু ভালো লাগছে না ভাইয়া। কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
– আচ্ছা তোর কথা বলতে হবে না, বাতিও জ্বালাতে হবে না। আমি তোর পাশে বসি কিছুক্ষণ।
নীলা কিছু না বলে উঠে বসল। সরফরাজ নীলার পাশে বসে বলল,
– এভাবে কেন ভেঙে পড়ছিস? তোর ভাইয়া আছে না? একবার আমাকে বলে তো দেখবি?
নীলা ভাইয়ার কোলে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে ফেলল।
[চলবে]
০৫/০৬/২০২২, ০৯.০০ AM
