গল্পছোট গল্প

পুনর্মিলন

পনের বছর পরে ভার্সিটির পুনর্মিলন অনুষ্ঠান। সবাই কে কোথায় ছিটকে গেছে কনভোকেশনের পর থেকে। সবুজে ঢাকা চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি। প্রথম দিকের শাটল ট্রেনের সেই দিন গুলো চোখে ভাসছে যেন। ইশরাত জাহান চৈতী এসেছে ফুটফুটে দুটো বাচ্চা আর বরকে নিয়ে। একটা বাচ্চা ক্লাস এইটে পড়ে। ছোটটা থ্রিতে। কিছুটা একা হতে ইচ্ছে করছে ওর। অনেক আগেই পৌঁছে গেছে ওরা। পরিচিত সেই মুখ গুলো কখন দেখবে ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে। বরকে একটু আসছি বলে শহীদ মিনারের দিকে হাঁটা দিলো। শাসসুন্নাহার হলের সেই দিন গুলো মনে পড়ছে খুব।

আহনাফ চৌধুরী ছিল ওদের ক্লাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছেলে। চুটিয়ে প্রেম করেছে দু’জনে। এই শহীদ মিনারের সামনে কত সন্ধ্যা চায়ে বিস্কিট ডুবিয়ে খেয়েছে। অসংখ্য ঘাস প্রাণ দিয়েছে দুজনের অভিসারে। সেই জায়গায় গিয়েই দাঁড়ালো। এই তো এই সেদিনেরই তো কথা। আহনাফ একটা রেপিং পেপারে মুড়িয়ে একটা বই উপহার দিলো। কিন্তু সেটা বই ছিল না। হলের রুমে এসে দেখে একটা ডায়েরি। পুরো ডায়েরীটা একটা চিঠি। ১৭৫ পেইজের সেই চিঠির পৃষ্ঠায় চৈতীর অশ্রুর দাগ এখনো লেগে আছে। সারা রাত এক বসায় শেষ করলো সেই চিঠি। ভালবাসার আকুতি কতোটা কাঙ্গাল করে সেই রাতে খুব করে বুঝলো চৈতী। শেষবার আহনাফের সাথে যখন দেখা সব ফিরিয়ে দিয়েছিল। সেই দিন বুকটা যে কতো ফাঁকা হয়ে গিয়েছিলো কেউ জানে না। সেই শূন্যতা আজো আছে।

হঠাৎ চোখ পড়লো একটা পেপারে মোড়া কি যেন পড়ে আছে। বুকটা ধ্বক করে উঠলো। মনে হলো সেই ডায়েরী। কিন্তু এটা এখানে আসবে কেন। এদিক ওদিক তাকালো। কেউ নেই আশেপাশে। সাহস করে হাতে নিলো। পেপার সরাতেই সারা শরীর কেঁপে উঠলো। সেই ডায়েরী। ১৭ বছর আগের সেই ডায়েরী। কোণ গুলো ছিঁড়ে গেছে। অনেক পুরনো হয়ে গেছে। ভিতরের পৃষ্ঠায় আহনাফের সেই এলোমেলো হাতের লেখা। ঠিক তেমনি উজ্জ্বল।

– “চা খাবে?”

পিছন ফিরে তাকালো। মাথায় হালকা টাক। ফর্সা মানুষটার চোখে মোটা চশমা। বেশ ঘন গোঁফ। এই সেই আহনাফ। কি হয়ে গেছে। হাসির মনে হয় বয়স বাড়ে না।

– “তুমি এতো বুড়া হয়ে গেছো?”

– “সময় কি থেমে থাকে? তোমার চোখের পাশে বয়সের ছাপ।”

ডায়েরীটা বুকে চেপে মাথা নিচু করে আছে চৈতী। হাত পা এখনো কাঁপছে।

– “ফিরিয়ে দিতে এলাম। এ ডায়েরী আমার নয়। জানতাম এখানে আসবে তুমি। আগে থেকেই ডায়েরীটা রেখে দিয়েছি। জানি খুব ছেলেমানুষি কাজ করেছি। তুমি ডায়েরীটা নেওয়ার পরে ভাবলাম চুপিচুপি চলে যাই। কিন্তু আর কখনো দেখা হবে না। এই জায়গায় আর তো পাবোনা তোমায়। তাই তোমার সাথে একটু থাকার লোভ সামলাতে পারিনি।”

– “কতো খুঁজেছি তোমায় জানো। কিছু না। শুধু ডায়েরীটা পাওয়ার জন্য….. কেউ আসেনি তোমার সাথে?”

– “একাই এসেছি। একটাই মেয়ে আমার। ওর মায়ের সাথে জার্মানি থাকে। আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। বেশ চলে যাচ্ছে দিন।”

– “ঢাকাতেই থাকো?”

চৈতীর বর বাচ্চা দুটোকে নিয়ে এদিকেই আসছে। তাড়াতাড়ি ডায়েরীটা ব্যাগে ভরে নিলো।

– “হ্যাঁ।”

– “কোথায়?”

বর আসতেই পরিচয় করিয়ে দিলো। দুই একটা কথা বলেই বিদায় নিলো আহনাফ। একটা মিৎসুবেশি পাজেরো তে উঠে এক টান দিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল।

বাচ্চার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে চৈতী। আহনাফ চলে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে মাইলের হিসেব বাড়বে। সময়ের হিসেব বাড়বে। দূরত্বের হিসেব বাড়বে। কিন্তু আজকের এই ক্ষণিকের অভিসার কখনো কি ভুলতে পারবে চৈতী। বুক চিরে কান্না আসছে। কাঁদতে পারছে না। চোখটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ।

০১/০৬/২০২২, ১০.০০ AM

Kuasha

হয় একদম শেষ অথবা একদম প্রথম, কোন কিছুর মাঝামাঝি থাকা আমার বড় অপছন্দ। আমি স্বপ্ন দেখি তা বাস্তবায়িত করার জন্য। একা থাকা, মুভি দেখা, পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকা ও বই পড়া আমার নেশা। খুব বিরক্ত লাগে পিছনে কিংবা আমার আড়ালে কেউ কথা বললে। লাইফ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে করতে নিজেই কখন যে এক্সপেরিমেন্টাল প্রজেক্টে রুপান্তরিত হয়েছি বুঝিনি। জীবনে অনেক কিছু হতে চেয়েছি। কিন্তু কিছুই হতে পারিনি। তার মানে এই নয় যে আমি ব্যর্থ একজন মানুষ। আমার ব্যর্থতাতেই আমার সফলতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *