আপনি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন
প্রসঙ্গঃ নিজেকে কিভাবে শুধরানো যায়। ভালো খায়েস। সেই ভালো খায়েসের সাথে অন্যের দোষ দেখে নিজেরে শুধানোর কথাটা ব্যাপকভাবে চালু আছে। প্রশ্ন হলো, এই ধরণের ইচ্ছে বা অভিপ্রায় আমাদের মনে ভর করে কেন? এই ধরণের চিন্তার পেছনে কোন দূরদর্শী পরিকল্পনা আছে কিনা? যদি থাকে, সেটা কি এই ভাবনার অনুরূপ।
অর্থ্যাৎ, আমরা যখন কোন কিছুকে প্রত্যাশা করি, তখন সেই প্রত্যাশার মধ্যে এমন কিছু কি থাকে, যেটা আমাকে বলে, এমন কিছু প্রত্যাশা করো। আরো মোটা দাগে, এমন সামগ্রিক চিন্তা ধারণ করতে পারি কিনা। ভুত-ভবিষ্যত সম্পর্কে বড়ো একটা চিত্র আঁকি আমি। এই চিত্র শেষ পর্যন্ত মূর্ত হয় কি না?
যে কোন বাছ-বিচারে নানা প্রেষণা থাকে, থাকে চাপ। কিন্ত শেষ বিচারে যেকোন পছন্দের দায়-দেনা ব্যক্তিরেই মেটাতে হয়। কিন্তু যে দায়-দেনায় সামষ্টিক ক্ষতির বিষয় থাকে, তাতে ব্যক্তিগত ক্ষতির সান্ত্বনার সুযোগ থাকে। এইসবই তো ঘটনা। সে ঘটনার জের কি আমরা টানি না। ঘটনার অন্দর মহলে আমরা কতটা পৌছতে পারি। আমরা সাধারণত লক্ষণ বিচারে ঘটনা ধামাচাপা দিতে সিদ্ধহস্ত। দেখা যাক অল্প কথায় নিজেকে প্রকাশ করা যায় কিনা।
এখন খেয়াল করেন, শুধরানো ভালো কাজ। তো ভালোর তরফে আমি। আর দোষ মানে খারাপ কিছু। তাইলে অন্য বা অপর বা আপনে’র তরফে আসে খারাপ। সোজা কথায়, আমি’র সাথে ভালোর সম্পর্ক অপরের সাথে খারাপ সম্পর্ক। অন্যের দোষ দেখে নিজেকে শুধরানো। কথাটা চমকপ্রদ ও নৈতিক নির্যাসপ্রসূত। সামষ্ঠিক দ্যোটানা আছে, আমার আপনার সকলের ভালো চাওয়া মতো একটা বিষয়।
ব্যাপারটা এমন যে সমাজের সকল লোক যদি এইভাবে ভাবে তাহলে জগত সংসারে আপনা আপনি একটা বিপ্লব ঘটে যাবে। সমাজে আর কেউ খারাপ থাকবে না। আপনার এই চাওয়ার মধ্যে কোন গোলমাল আছে বলব না, মানে নিয়তের মধ্যে। কিন্তু ঘটনা আকারে এর মূল্য নিতান্তই প্রত্যাশা। এরমধ্যে কি অক্ষমতা, চিন্তার জড়তা বা আত্মগোপন নাই?
এখন খেয়াল করেন, শুধরানো ভালো কাজ। তো ভালোর তরফে আমি। আর দোষ মানে খারাপ কিছু। তাইলে অন্য বা অপর বা আপনে’র তরফে আসে খারাপ। সোজা কথায়, আমি’র সাথে ভালোর সম্পর্ক অপরের সাথে খারাপ সম্পর্ক। তাইলে যেটা আমার না, তারে আমি আমার চেয়ে ভালো করে কেমনে চিনব। আফটার অল কমন ডায়লগ, আমারে কেউ চিনল না। সে জায়গায় দাঁড়াইয়া আপনে অন্য ‘আমি’রে কেমনে চিনতেছেন। যদি আপনি তারে চিনতে পারেন, ভালো কথা। কিন্তু আপনেরে না চিনে নিশ্চয় তারে চিনেন নাই। তাইলে নিজেরে শুধরাতে অন্যেরে দেখতে হবে কেন? একইভাবে খারাপের তরফে এই অন্যেরে দাঁড় করানো এইটা কতটা নৈতিক চিন্তা হইতে পারে?
তো, এই শিক্ষা-দিক্ষা বা শুধরানোর মধ্যে গরমিল আছে। যেহেতু ভালো মানে খারাপ না। একই হেতুতে অপর মানে আমি না। সেখানে আমি দিয়া অপরকে বা অপরকে দিয়ে আমি’কে বুঝতে গেলে লাঞ্চনাকর ঘটনা ঘটে। যেটাতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় অপর নামক কিছু। তো, এই চাওয়াটাও ভালো আমি’কে কুলষিত করে, যদি এমন কিছু থাকে। তাছাড়া দুটো ঘটনা দেখতে একই হলেও এর কার্য কারণ কি একই থাকে। আসুন এতক্ষণ বলা কথাগুলো আবার ভাবতে থাকি। প্রথমে এই প্রশ্ন তুলেছিলাম কেন অপরকে দিয়ে নিজের ভালোত্ব দেখতে হয়। আরো সম্ভাবনাকে এখানে যোগ করা যাক।
প্রথমতঃ সত্য নির্ণয়ের সাওয়াল। প্রথাগতভাবে সত্য আর সৎচিন্তাকে এক করে দেখা হয়। যা সত্য তা কি নৈতিক? আবার সেই সত্যকে দেখা হয় বিষয়গত নিরিখে। এমন একটা বিমূর্ত সত্য আছে,যার কাছে ব্যক্তি মাত্র ভ্রান্ত। তাই তারে নিদের্শনা দিতে হয়। সেটা হলো সত্যের দিকে। আর যা সত্য,তাই নৈতিক। সেই নৈতিকতার ভার আবার ব্যক্তির উপরে দেয়া যায় না।
তাই দোষের দোষী ব্যক্তিরে খারিজ করে বিষয়গত সত্যে জোর দিতে হয়। অবশ্য বিষয়গত সত্য আর এর মূল্যমান নিয়ে আজ কথা তুলছি না। নিঃসন্দেহে তারে আমরা ঝাড়ে-মূলে উচ্ছেদের কথা বলি না। কিন্তু এরমধ্যে যদি মূর্তমান নিজেরে দেখতে না পাই তবে সারা জীবন সত্যম সুন্দরম শিবমের জন্য বেহুদা অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াতে হবে।
দ্বিতীয়তঃ অন্যের সাথে আমার বুঝাবুঝির সমস্যা। যেহেতু অন্যেরা আমারে বুঝেন না, তাই অন্যের মন আমি বুঝি না। সেই না বুঝাবুঝি সত্ত্বেও আমারে অন্যের সাথে কথা কইতে হয়। এখন এই কথা কইবার ক্ষেত্রে বড়ো বিপত্তি হলো, মানুষের মনের ভেতর খবর কেমনে জানব। এই বিষয়ে বিস্তারিত না গিয়ে এই বলি-এইখানে কিছু আগাম অনুমান থাকে। দুষ্টু গরু রাখব, শূন্য গোয়াল কোনমতেই না। একই সাথে নিজের অন্দরমহলে অন্য কেউ ঢুকে পড়বে সেই ভয়ে আমি কাবু।
শুরুতেই এই সাথে সমাজের সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। অন্য দিয়ে নিজেকে শুধরানো সমাজে খুবই প্রচলিত ধারণা।যে চিন্তা সামাজিক সাধারণ চিন্তাকারে বিদ্যমান থাকে,তার কার্যকারিতা হলো বিদ্যমান সমাজ কাঠামোর মধ্যেই সমাজ যে সুরাহা চায়, সে নিরিখে চিন্তা করা।এখানে চিন্তার ভিন্নতার চেয়ে চিন্তার সমরূপতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এখন সবার ক্ষেত্রে অন্যকে দেখে দেখে শেখা এই চিন্তাটা বিশেষ মানুষে বিশেষভাবে উদয় হলেও সামাজিক উদ্দেশ্য একই। সেখানে সমাজের বৃহৎ অংশের মধ্যে ব্যক্তি বিশেষ অংশাকারে হাজির, আলাদা কিছু নয়।
যখন আপনি কোন কিছুকে সামাজিক হাজিরানা বা জায়েজ-নাজায়েজ দিয়ে চিন্তা করবেন, তখন সেটা মোটাদাগে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত বিষয়াকারে হাজির।কিন্তু আপন বোধ বুদ্ধি চিন্তা বিচার ক্ষমতার কাছে সে আসলে কিভাবে চায়, কেন চায় সে বিচার আমার কাছে পরিষ্কার না। সেটা পরিস্কার না হলে, অপরের তরফে শুধু দোষই আসবে।
সেই মোতাবেক আমি’র ভালো-মন্দের বিচার হবে আমি’কে দিয়ে। এই আমি দিয়ে মোকাবেলা করতে না পারলে আমি’র সাপেক্ষিক সংশোধন নতুন নতুন বিভ্রান্তির সম্ভবনা তৈয়ার করে। সেখানে আমি হলো তাল গাছ গোছের কিছু একটা। আর শেষ বিচারে, আমি মানে ভালো- বর্ণবাদী ধারণা। তাইলে শুধরানোর এই চিন্তায় অপরের চেয়ে আমি’তে জোর দিতে হবে। ভালো-মন্দের মিশেল এই আমি। তো যদি প্রকৃত আমি’র দেখা পেতে চান, যে ভেদবিচারের মধ্যে আমি আছি, তার বাইরে যেতে হবে-আবার ভেদ যেহেতু আছে, তার মূল্যের হিসাব কষতে হবে। এই শেষ কথাটা যৌক্তিক অনুমান মাত্র।
কাবিলদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য দরবেশ দশায় উপনীত হতে হবেঃ ‘তাহাকেই দরবেশ বলা হয়, অজ্ঞাত যার সজ্ঞাত। প্রজ্ঞা যার প্রখর। যিনি সহজ। যিনি প্রথার পায়রবি করেন না। সৎ বাক্যে, প্রকাশে কবি। বাক্য সরল, কিন্তু নববধূর মত সালংকারা। দরবেশ দিব্য জ্ঞানের খবর রাখে। খরাক্ষিপ্ত মানুষকে বলে, আজ বৃষ্টি হবে। জমিনে গিয়ে দাঁড়ান। আকাশে মেঘের কোন আড্ডা নাই।
স্বৈরাচারি রোদ মগজ গলায়। এত তাপ। তার চোখ আসমানের মেঘেদের কিছু বলে। যখন বস্তুজগত স্মৃতিময়, শ্রুতিময় হয়ে ওঠে ও বাঙ্ময়, প্রাণময় হয়ে হুকুম মানতে শুরু করে, তখন জগতে “দরবেশ’ অবস্থা তৈরি হয়। মানুষের জ্ঞাত স্বভাব-চরিত্রের বাইরে আর সবকিছুই মানুষের পরম অবলম্বন। যেমন, কোন ল্যাঙটা ফকিরের কোন শিষ্যের অভাব হয় না। মানুষ বিপদে পড়লে অস্বাভাবিক মানুষের শরণাপন্ন হয়”।
১৬/০৫/২০২২, ০৯.৩০ AM
