কলকাতার বাঈজী কথন
ঈশ্বর গুপ্তের কলমে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের কলকাতায় বাঈ-বিলাসের প্রতিচ্ছবি কিছুটা ধরা পড়েছিল। ঐকালের বাবু বিলাসের প্রধান উপকরণ ছিল বাঈ নাচ। তবে এমন জলসা সেকালের কলকাতায় নতুন কিছু ছিল না। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই এ শহরে বাঈ নাচের নেশা লেগেছিল। কিছু একটা উপলক্ষ্য থাকলেই হল। অভিজাত বাবুদের প্রাসাদে মুজরো বসে যেত। দোল-দুর্গোসবে, বিয়ে বা মুখেভাতে বাঈ-নাচ দেওয়া প্রায় রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মুজরোর খরচের বহর দেখিয়ে কিংবা রূপ-জৌলুসে চোখ ধাঁধিয়ে একে অপরকে টেক্কা দিতেই বাবুরা বড় আমোদ পেতেন।
দিল্লীর বাদশাহের রংমহল থেকে দেশের নানা প্রান্তের রাজা-মহারাজদের দরবারে নটি রাখার প্রথা ছড়িয়ে পড়েছিল। মুঘল আমলে বাদশাহী কানুন, দরবারী আদব-কায়দা বা ঐশ্বর্য সম্ভারের দিকে সবিস্ময়ে লক্ষ্য রেখে দেশের রাজা-মহারাজরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অনুকরণ করতেন। এইভাবে নাচগানের চর্চা দরবারগুলিতে স্থায়ী স্থান পেয়েছিল। মুঘল বা বাদশাহী আমলের সমাপ্তি ঘটলেও দরবারী এই প্রথা তার পরবর্তীকালেও ছিল অক্ষুন্ন।

কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই বাঈজী প্রথা পরিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে দেখা যায় যে দেশের বিভিন্ন অংশে শাসকরা বিভিন্ন সময়ে নিজস্ব রীতিতে দরবার সাজিয়েছেন। এইভাবে বাঈজী প্রথা সারাদেশে অক্ষুন্ন ছিল। ক্রমশ বাঈ নাচ ভারতীয় সমাজে সীমাবদ্ধ না থেকে ইউরোপীয় সমাজেও প্রচলিত ছিল। বাঈ নাচ সেসময়ে রাজাদের ‘আভিজাত্যের প্রতিক’ হিসেবে ব্যবহৃত হত। সেকালের কলকাতার ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে পাল্লা দেওয়া ও রেষারেষি এই নর্তকীদের মাধ্যমেই জমে ওঠে।
এঁরা যে কেবলমাত্র উৎসব-অনুষ্ঠানেই নাচতেন তা নয়। নিজেদের বাড়িতেও এঁরা নাচগানের আসর বসাতেন। বাঈ নাচের সঙ্গে যে মার্গসঙ্গীত শোনা যেত, সেই গানের প্রতি প্রথম যুগে সাহেবদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা আকর্ষণ ছিল না। সুন্দরী বাঈজীদের উপস্থিতি আর অঙ্গ-ভঙ্গীর উত্তেজনাটুকু বহু ইউরোপীয়কে প্রায় উন্মাদ করেছিল তাই বাবুদের আমন্ত্রণে যোগ দেওয়া ছাড়াও অনেকসময় ইউরোপীয়রা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে বাঈ নাচের আসর বসাতেন। ব্রিটিশ আমলে দরবার সজ্জা, স্থাপত্য, চিত্রকলা, বেশবাসে যদিও ইউরোপীয় প্রভাব খুব স্পষ্ট ছিল, কিন্তু বাঈজীদের ঐতিহ্যগত ধারাবাহিকতায়, হিন্দুস্থানী মার্গসঙ্গীত ও নৃত্যকলার ওপর পরম্পরাগত সংস্কৃতি ধারার বদল ঘটাতে পারেননি।

‘বাঈজী’ কথাটির ‘বাঈ’ শব্দটি মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাট প্রভৃতি রাজ্যে সুপরিচিত। ‘বাঈ’ শব্দ সেখানে সম্ভ্রান্ত মহিলা অর্থে পরিচিত। পূর্বে সম্ভ্রান্ত মহিলারা নৃত্য-গীতাদিতে সুশিক্ষিতা হতেন। পরে পেশাদারি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে তাকে ‘বাঈ’ নর্তকী বোঝায়। ‘জী’ গৌরবার্থে উচ্চশ্রেনীর নর্তকী বোঝায়। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে এই বাজীদের মধ্যে আবার চারটি শ্রেণী ছিল।
যাঁর নামের সঙ্গে শুধু ‘বাঈ’ শব্দটি ব্যবহৃত হত তিনি শুধু গান করতেন। যাঁর নামের সঙ্গে ‘জান’ শব্দটি ব্যবহৃত হত তিনি নাচ ও গান দুটিই করতেন। তৃতীয় জনকে ‘কানীজ’ বলা হত যিনি অতিথিদের আদর-আপ্যায়ন করতেন এবং মদ পরিবেশন করতেন। আর চতুর্থ জনকে ‘খানাগী’ বলা হত যিনি বেশ্যাবৃত্তি করতেন।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে কলকাতায় বাবুগিরির বড় টালমাটাল অবস্থা। বানিজ্যলক্ষীর কৃপা ও কটাক্ষে কেউ উঠতি আবার কেউবা পড়তির মুখে। ঠিক সেই অসময়ে নগরীতে যেন আকাশের একঝাঁক তারা খসে পড়ল। আওধের কলা-রসিক নবাব ওয়াজেদ আলী শা মসনদ হারিয়ে লখনৌ থেকে আশ্রয় নিলেন কলকাতায়। ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতার গার্ডেনরিচ এলাকার গঙ্গার ধারে নবাব আর তার হাজার সঙ্গীসাথী লোকলস্কর ডেরা বাঁধলেন। ভাগ্যহত হলেও লখনৌ ছেড়ে আসবার সময় তাঁর হারেমের বেগম-বাঁদী আর প্রায় তিনশত সুন্দরী নর্তকীদের সঙ্গে আনতে ভোলেননি।
লখনৌর দরবারের ঐতিহ্য জারি রাখতে গিয়ে নবাবের মেটিয়াবুরুজের প্রাসাদে রঙ তামাশা ও নাচগানের আসর চলত সবসময়। বিলাসিতার স্রোতে ভেসে চলেছিল নবাব মহলের সব বেগম, দাসী-বাঁদী, চাটুকারের দল। ১৮৮৭ খ্রীষ্টাব্দে নবাবের মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গেই সব স্বপ্নের সলিল সমাধি হলো। নর্তকী-বেগমদের অনেকেই নবাবের ভাঙ্গা হাট ছেড়ে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়েন।
১৮৫৮ সালের শেষদিকে পতন হয়ে ১৮৮৭ সালে নবাবের মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর মেটিয়াবুরুজের দরবার সগৌরবে বর্তমান ছিল। ভারতবর্ষের নানা কেন্দ্র থেকে এই দরবারে ওস্তাদ-বাঈজীদের আগমন হত। কলকাতারসাংস্কৃতিক পরিবেশ, লখনৌ, বেনারস, উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানের বাঈজীদের এখানে বসবাসের স্বপ্ন দেখিয়েছে। তাই বহু বাঈজী উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে বসবাস শুরু করেন এই শহরে। সেরা বাঈজীদের অধিকাংশই ছিল অবাঙালি। সঙ্গীতজ্ঞা ছাড়াও এই বাঈজীদের অনেকেই ছিলেন সুকবি।

উনিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলার সেই ঐতিহাসিক লগ্ন। সাংস্কৃতিক নানা বিভাগেই সেই শতাব্দীর শেষার্ধ বিপুল প্রেরণা যুগিয়েছিল। কলকাতা তথা বাংলার সঙ্গীত ক্ষেত্রও তখন নব নব কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টিতে বিভোর। ভারতীয় সঙ্গীতের মূলধারা- রাগসঙ্গীতের চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে বাঙালি প্রতিভা। কলকাতায় খেয়াল ঠুংরীর সত্যিকারের চর্চা ও খানদান শুরু হয় ১৮৫৬ সালে লখনৌ থেকে যখন নবাব ওয়াজেদ আলী শা মেটিয়াবুরুজে বন্দী জীবন কাটান সঙ্গে আনা ওস্তাদ-কলাবন্তদের সাহচর্যে। ঠুমরী গানের যোগসূত্র যেন নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ এর দরবারের তওয়ায়েফ বা বাঈজীদের সঙ্গেই।

বাংলার রাগসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে মেটিয়াবুরুজের দরবার। এদিক থেকে বিচার করলে নবাবের জীবনের নির্বাচনের অভিশাপ বাংলার সঙ্গীত জগতের আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। সেই সময় যাঁরা এই বাঈজীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাঁরা হলেন রাধারমণ রায়, নীলমণি মল্লিক, রূপচাঁদ রায়, গোপীমোহন দেব, রাজা রামমোহন রায়, রাজা রাজকৃষ্ণ, রাজা নবকৃষ্ণ দেব, ইত্যাদি। তখনকার বিখ্যাত বাঈজীরা যাঁরা উল্লিখিত ব্যক্তিদের বাড়ি গান ও নৃত্যের প্রদর্শন করতেন তাঁরা হলেন নিকীবাঈ, হিঙ্গুনবাঈ, বেগমজান, সুপন্ বাঈ, হুসনাবাঈ, আশরুণবাঈ, হীরা বুলবুল ইত্যাদি।
পরবর্তীকালে যে সব বিখ্যাত বাঈজী কলকাতায় এসে বসবাস করতে থাকেন এবং বিভিন্ন ধনীগৃহে সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করতে শুরু করেন তাঁরা হলেন বড়ী মালকাজান, গওহরজান, মালকাজান অগ্রেওয়ালী, জানকীবাঈ, মালকাজান চুলবুলওয়ালী প্রভৃতি অবাঙালি বাঈজী গোষ্ঠী। বাঙালি বাঈজীদের মধ্যে অগ্রগন্যা ছিলেন হরিমতি, যাদুমনি, মানদাসুন্দরী, কৃষ্ণভামিনী, আশ্চর্যময়ী, পান্নাময়ী, আঙ্গুরবালা ও ইন্দুবালা প্রভৃতি।

বড়ী মালকাজান : এঁর আসল নাম ছিল এডেলাইন ভিক্টোরিয়া হেসিংখ। পরিস্থিতির চাপে ইনি ধর্মান্তরিত হয়ে নাম নেন মালকাজান। ইনি জাতে আর্মেনিয়ান ছিলেন। বড়ী মালকাজান গায়িকার থেকে কবি হিসাবে বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর কবিতার বইয়ের নাম ‘মখজান-ই–উলফত্-ই-মালিকা’। মেয়ে গওহরজানের মত বাংলাতে গান গেয়েছিলেন ও রেকর্ড করেছিলেন।

গওহরজান: তাঁর জন্মনাম ছিল ঈলীন এঞ্জেলিনা ইওয়ার্ড। ধর্মান্তর হওয়ার পর নাম হয় গওহরজান। গওহরজান গান শিখেছিলেন শ্রীজান বাঈএর কাছে। ধ্রুপদ ধামার কাল্লু ওস্তাদ বা ওস্তাদ কালে খাঁর কাছে খেয়াল ও ঠুমরী ও কত্থক সম্রাট বিন্দাদীন মহারাজের কাছে কত্থক নাচ। এবং চরনদাসের কাছে কীর্তন। এছাড়াও পরবর্তীকালে উনি তালিম পান শিবপ্রসাদ মিশ্র, ভাইয়া সাহেব গণপত রাও, মৌজুদ্দিন খাঁ, পেয়ারা সাহেব, রামপুরের নাজির খান ও সারেঙ্গী বাদক বেচু মিশ্র।
গওহরজানের গান সম্পর্কে অমিয়নাথ সান্যাল ‘স্মৃতির অতলে’ গ্রন্থে লিখেছেন “বৈঠকে গওহরের আগমনের অর্থ জল্পনা-কল্পনা, লন্ডভন্ড। তাকে মনে করতে গেলেই খুব বড় হয়ে দেখা দেয় সেই বিচিত্র জীবন আর অদ্ভুত প্রতিভা। কিন্তু সেই সন্ধ্যালয়ের গহর বলতে মনে পড়ছে, এলোমেলো হাওয়ার একটি ঘূর্ণি যা নিজেও থাকেনা। নরকেও দিশাহারা করে দিয়ে যায়”। গওহরজান প্রায় দশটি ভাষায় গান করতে পারতেন এবং রেকর্ডও করেছিলেন।
বাঈজী বা যৌন জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে পড়ুন –
- কামের ফাঁদ
- সপ্তর্ষির সপ্ত ঋষি
- যৌবনের মৌবনে
- যৌবনের মৌ নিয়ন্ত্রক
- ভন্ড প্রেমিকদের প্রশ্ন পত্র ফাঁস
- যৌন জীবন ও অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন
- নায়লা নাঈমঃ আইটেম গার্লের আবির্ভাব
- ইলুমিনাতি – এক গুপ্ত সংঘের অজানা ইতিহাস
মালকাজান আগ্রাওয়ালি: ইনি একসময় চৌধুরানের সম্মান পেতেন। মালকাজান তালিম পেয়েছিলেন আগ্রার গুলাম আব্বাস খান ও তাঁর পৌত্র ওস্তাদ ফৈয়াজ খান সাহেবের কাছে। কথিত আছে ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের সাথে প্রনয় ছিল। ঠুমরীর তালিম পান ভাইয়া সাহেব গণপত রাও ও মৌজুদ্দিন খানের কাছে। মালকাজান ও ভালো কবিতা লিখতেন।

হরিমতী: জমিরুদ্দিন খানের শিষ্যা। প্রতিভাময়ী গায়িকা ছিলেন। ধ্রুপদ ও ঠুমরী গানে দক্ষ ছিলেন।
যাদুমনি: ইনি রাজা শৌরীন্দ্র মোহন ঠাকুরের বাড়ির পরিচারিকার কন্যা ছিলেন। এবং যাদুমনি’র কৃপায় সঙ্গীত শিক্ষার সুযোগ পান। খেয়াল, টপ্পা ও ঠুংরীতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তালিম পেয়েছিলেন গুরুপ্রসাদ মিশ্র, জগদীশ মিশ্র ও সারদা সহায় মিশ্রের কাছে। ইনি একজন সু-অভিনেত্রীও ছিলেন।
মানদাসুন্দরীদাসী: বেনারসের বিখ্যাত ধ্রুপদি বিশ্বনাথ রাও ধামারীর শিষ্যা ছিলেন। টপ্পা ও টপ্ খেয়ালে বিখ্যাত ছিলেন। সুমিষ্ট কন্ঠস্বর ও আবেগঘন পরিবেশনার জন্য এতই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন যে গ্রামোফোন রেকর্ডের আদি যুগে গায়ক-গায়িকাদের মধ্যে শীর্ষ স্থান লাভ করেন।

কৃষ্ণভামিনী: উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম দিককার কলকাতার সুবিখ্যাত বাঈজী শ্রেনীর গায়িকা। নৃত্য, গীত ও যন্ত্রবাদনে অসাধারণ গুণপনা অর্জন করেন। বাঙালি বাঈদের মধ্যে তাঁর স্থান ছিল অতি উচ্চ। ইনি তালিম পান বেনারসের প্রসুদ্দ মনোহর ঘরানার গৌরীশংকর মিশ্র ও হরিদাস মিশ্রের কাছে। বাংলার বিশিষ্ট টপ্পা শিল্পী কালিদাস পাঠক তাঁর কাছে সঙ্গীত শিক্ষা করেন।
আশ্চর্যময়ীদাসী: জন্মসুত্রে ইনি নেপালি ছিলেন। সুগায়িকা ছাড়াও সুঅভিনেত্রী ছিলেন। থিয়েটারে উনি যখন গান করতেন তখন দর্শকদের চোখের কোনে অশ্রুকনার মানিক ঘনিয়ে উঠত। সঙ্গীতজগতে তিনি ‘নাইটিংগেইল’ বলে পরিচিত ছিলেন।
পান্নাময়ী: অত্যন্ত প্রতিভাময়ী গায়িকা ছিলেন। কীর্তনগানে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন।

আঙ্গুরবালা: স্বনামধন্যা কণ্ঠসঙ্গীত শিল্পী। আসল নাম প্রভাবতী দেবী। নজরুলগীতি রূপায়নের জন্যে দৃষ্টান্ত স্থানীয় ছিলেন। অভিনয়েও খ্যাতি ছিল। আঙ্গুরবালা’র গুরুরা ছিলেন পিতৃবন্ধু অমূল্য মজুমদার, জিতু ওস্তাদ, রামপ্রসাদ মিশ্র। তবে আঙ্গুরবালার পরিনত সঙ্গীত শিক্ষা ঘটে ওস্তাদ জমিরুদ্দিন খাঁর অধীনে। পদাবলী কীর্তন শেখেন ঈশান ঠাকুরের কাছে এবং নজরুলগীতির পাঠ নেন স্বয়ং নজরুলের কাছে।
ইন্দুবালা: বাংলা গানের ইতিহাসে যাঁরা সম্রাঞ্জীর আসনে সঙ্গীতজগতকে শাসন করেছেন দীর্ঘদিন, যাঁদের কীর্তি-কাহিনী সঙ্গীত-রাজ্যের প্রজারা অহংকার করেন- ইন্দুবালা তাঁদেরই একজন। সার্কাস দম্পতি মতিলাল বসু ও রাজবালার কন্যা। ইন্দুবালা তালিম পান গৌরীশঙ্কর মিশ্রের কাছে। এই সময়ে এঁর গান শুনে গওহরজান ইন্দুবালাকে কাছে টেনে নেন ও শিক্ষা দিতে শুরু করেন। গওহরজান ইন্দুবালা’র গুরু ও সখী ছিলেন। পরবর্তীকালে ইন্দুবালা কালীপ্রসাদ মিশ্র, এলাহিবক্স, মা রাজবালা আর রামবাগানের অনামা সব বাঈজীদের কাছে তালিম পান। কাজী নজরুলের কাছে শিখেছিলেন নজরুলগীতি। রামবাগানের মেয়ে হয়েই মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য প্রানপন করে গেছেন সারাটা জীবন। বার বার সগর্বে ঘোষণা করেছেন “আমি রামবাগানের মেয়ে ইন্দুবালা”।

জানকীবাঈ- এলাহাবাদ: বেনারসের এই কিংবদন্তি বাঈজীর শিক্ষা লখনৌর ওস্তাদ হস্সু খানের কাছে। ইনি ইংরাজি, সংস্কৃত ও ফারসী ভাষাও শিক্ষা করেন। ইনি একজন সুকবিও ছিলেন এবং এঁর কবিতার বইয়ের নাম “দিওয়ান-ই-জানকী”। ১৯১১ সালে যখন রাজা পঞ্চম জর্জ এলাহাবাদ দর্শনে যান, তখন এক বিরাট মেহফিলের আয়োজন করা হয় এবং গওহরজানের গানের থেকে ঐ অনুষ্ঠানে জানকীবাঈ এর গানের কদর হয় বেশি। জানকীবাঈ এর গ্রামোফোন রেকর্ডার চাহিদা ছিল খুব। এবং তখনকার দিনে জানকীবাঈ ২০০০ টাকা নিতেন রেকর্ডিং করার জন্যে। জানকীবাঈ এর প্রেমিক তাকে ৫৬ বার ছুরিকাহত করার জন্য ইনি জানকীবাঈ ৫৬ ছুরি নামে বিশেষ পরিচিত ছিলেন।
বেগম আখতার: লখনৌর এই কিংবদন্তী শিল্পীর শিক্ষা ওস্তাদ আতা মহম্মদ খানের কাছে। ১৩ বছর বয়সে ইনি মা মুস্তারীবাঈ ও গুরুর সঙ্গে কলকাতার রিপন স্ট্রীটে এসে বসবাস শুরু করেন জীবিকার জন্য। সুবিখ্যাত অভিনেত্রী নার্গিসের মা জদ্দনবাঈ আখতারীর গান শুনে বেগম আখতারকে আকাশবাণীতে গাইতে অনুরোধ করেন। এবং রেডিওতে তাঁর গান শুনে কলকাতার শ্রোতারা অভিভূত হয়ে পড়ে। বেগম আখতার অনেক ছবিতে অভিনয় করেন যেমন ‘নল ও দময়ন্তী’, ‘নাচরঙ্গ’, ‘একদিন বাদশাহাত’ (১৯৩৩), ‘মুমতাজ বেগম’ (১৯৩৪), ‘আমীনা’ (১৯৩৪), ‘জওয়ানী কা নেশা’ (১৯৩৫), ‘ নাসীব কা চক্কর’ (১৯৩৫) ও জলসাঘর। বেগম আখতার থিয়েটারেও অভিনয় করেন যেমন ‘নঈ দুলহন’, ‘সীতা’, ‘নল-দময়ন্তী’ ইত্যাদি। ১৯৪২ সালে বেগম আখতার লখনৌ ফিরে যান।
০৯/০৪/২০২২, ০২.৫৫ PM
অথ্যসূত্রঃ
১। বাংলা উইকিপিডিয়া
