প্রেমে অপ্রেমে
মেয়েটা রাইফেল স্কয়ারের সামনে ফুডকার্টের পেতে রাখা চেয়ারে হন্তদন্তভাবে বসে পড়লো। বসার ইচ্ছা ছিলনা। মাথাটা ঘুরে ওঠার কারণেই বসে পড়া। টেবিলের উপর মাথাটা নিচু করে পেতে রাখে। আশেপাশে তেমন লোকজন ছিলনা। তবে ওয়েটারের চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি সে। ১৪/১৫ বছর বয়সি ওয়েটার দৌড়ে এসে জিজ্ঞাসা করে,
– আপা কি হইছে? শরীর খারাপ লাগতাছে?
মেয়েটা নিজেকে সামলে বলে,
– নাহ ঠিক আছি। এক গ্লাস পানি দাওতো ভাইয়া।
– এক গ্লাস না। নিলে পুরা বোতল নেয়া লাগবে।
– আচ্ছা তাই দাও।
ক্ষীণ গলায় উত্তর দেয়া রুপ। ও মেয়েটার নাম বলা হয়নি। রুপা। পুরো নাম জাহানারা আক্তার রুপা। ঠাণ্ডা এক বোতল পানি সাথে টিস্যু দিয়ে যায় ছেলেটা। রুপা কখনো এভাবে ভেঙ্গে পড়েনি মানসিক ভাবে। আজ কোন কিছুই তাকে সাপোর্ট দিচ্ছেনা। ডাক্তার টেস্ট দিয়েছে। তবে এই টেস্ট সে করাবেনা। দরকার হয় জীবন দেবে। আর যদি করায়ও লাভ কি?
পরীক্ষিত, বিশ্বস্ত আশে পাশের মানুষগুলোই তার সাথে প্রতারণা করেছে। যদি সম্ভব হত তাদের টেস্ট নেয়া যেত। অনেক বাধাবিপত্তি পেড়িয়ে রুপা এ শহরে এসেছিল। বাবা এলাকার মুদি দোকানি। মা গৃহিণী। ভাগ্যক্রমে সে কলেজ পর্যন্ত উঠেছিল। এর পর বছর চারেক চেস্টায়ও সে পড়া শোনায় আর ঢুকতে পারেনি। তার ছোট আরো দুই ভাই আছে। আগুন লেগে রুপার বাবার দোকানটা পুড়ে যায়। রুপার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।
জীবনকে একটা মর্যাদা পূর্ণ জায়গায় নেয়ার খুব ইচ্ছে ছিল রুপার। বাবা মা চেয়েছিলেন বিয়ে দিতে। সে জোর জবরদস্তী করেই ঢাকা আসে। ঢাকা এত সহজ জায়গা না। এখানে যার মাথা গোঁজার জায়গা থাকেনা তার আর রাস্তার কুকুরের একই হাল হয়। তবুও ভাগ্যিস রুপার দূরসম্পর্কের এক খালা ছিল পুরান ঢাকায়। তার বাসায় সে উঠে। মাস ছয়েক একরকম গা ঢাকা দিয়েই থাকে। বাড়ি থেকে অনেক অনুরোধ করা হয়েছে রুপাকে। যেন সে বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা।
এ শহরে সে একটা কিছু করবেই। সেও বুঝে গেছে এই অল্প পড়াশোনা জানা মেয়েকে কেউ চাকরী দেবেনা। তার খালা এক প্রাইভেট কোম্পানির রিসেপশোনিস্ট। সেই রুপাকে একটা চাকরী নিয়ে দেয় অবশেষে। ঢাকার ব্র্যান্ডেড এক পোশাকের দোকানের সেলসগার্ল হিসেবে। রুপার আর্থিক দুর্দশা কাটতে থাকে। মেসে উঠে। বেতন খুব সামান্য হলেও নিজের থাকা খাওয়ার খরচটা চালিয়ে নিতে পারে। মনোযোগ দিয়ে কাজ করে। বাড়িতে ছোট দুইভাইকে সে নিজের খরচে মানুষ করতে চায়। দায়িত্ব নিতে চায় বাবা মার। বড় ছেলের ভুমিকায় থাকতে চায়।
সে যেখানে চাকরী করে সেখানে ম্যানেজারের বুদ্ধিতে কম্পিউটার কোর্সে ভর্তিও হয়। রঙ্গিন ঢাকায় সে একটু একটু আস্থা পেতে শুরু করে। চেস্টায় কি না হয়। একবার দোকানে ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে আসে। পাঞ্জাবি কিনতে। রুপার মার্জিত আচরণে রুপাকে তার ভালো লেগে যায়। আর তাছাড়া রুপা দেখতে খুব সুন্দরি না হলেও চেহারায় বেশ মায়া মায়া ভাব আছে। ছেলেটা দু একদিন পর পরই আসে। দুজনের মাঝে বেশ সখ্যতাও গড়ে উঠে। ছুটির দিনে তারা ঘুরতে বেড় হয়। গ্রামের মেয়ে আকাশ দেখাকে ওভাবে কোনদিন পাত্তা দেয়নি। ও ছেলেটার নাম শামিম।
রুপা শামিমের সখ্যতায় নতুন করে আকাশ দেখতে শেখে। পাখি দেখে। বুড়িগঙ্গার কালো পানি দেখে সেও মর্মাহত হয় শামিমের মত। শামিমের প্রতিটি আচরণেই সে মুগ্ধ হতে থাকে। তার ব্যক্তিত্বে রুপা নিজের অজান্তেই তাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ শপ্ন দেখতে থাকে। এই সপ্ন দেখার সুযোগ অবশ্য শামিমই দিয়েছে। শামিমের বাড়ী এ শহরেই। শামিমের নিরাহংকারি মনোভাব দেখেই তার প্রেমে পড়ে রুপা। শামিমের বাড়ী এ শহরে হলেও আর্থিক অবস্থা যে খুব ভাল তা নয়। সে নিজেও টিউশানি করে। বাবা নেই। মা প্যারালাইজড। শামিমের মনঃকষ্টগুলোকে পরখ করে রুপা। খুব অল্প দিন নয়। এভাবে চলে টানা তিনটা বছর। একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠে তারা।
হঠাত করেই রুপার চাকরী চলে যায়। অন্য সহকর্মীরা তাকে সহ্য করতে পারতোনা। শামিমের সাথে রুপার প্রেমকে জড়িয়ে তারা মালিকের কাছে অভিযোগ দিয়েছিল। এ সমাজে নেশা উন্মুক্ত অলিখিতভাবে বৈধ। কিন্তু প্রেম ভালোবাসা এখনো বৈধ নয়। রুপার মাথায় বাজ পড়ে। রুপার বাবা মারা যায় ব্রেইন স্ট্রোকে। পারিবারিক চাপ এসে পড়ে রুপার উপড়ে। তবে শামিম রুপাকে ছেড়ে যায়নি। যাবেই বা কেন। সেও তো তাকে মন থেকে ভালবাসে। রুপার কোন সন্দেহ নেই শামিমের ভালবাসার গভিরতা নিয়ে।
শামিম রুপাকে নিয়ে যায় তার মার কাছে। পরিচয় করিয়ে দেয়। আর তাছাড়া চাইলেই সে রুপাকে বিয়ে করতে পারে। কারণ তারও একটা চাকরী হয়েছে। বেতনও খারাপ না। যথেষ্ট ভালই বলা যায়। তবে রুপার মার কাছেও প্রস্তাবটাতো দিতে হবে। রুপা গ্রামে চলে যায়। মাকে সব খুলে বলে। এ শহরে শামিমের মত একটা আশ্রয় বলতে, ভবিষ্যৎ সঙ্গি বলতে শামিমকে বিনা প্রশ্নেই গ্রহণ করা যায়। রুপার মা কোন আপত্তি করেনি। শুধু একবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে মেয়েক বলে,
– ‘মা’রে মানুষের মন খুব বিচিত্র। বদলানোর কোন সময় অসময় থাকেনা। তুই যা ভালমনে করিস তাই করিস’।
রুপা ফিরে আসে শহরে। যে শামিম ঘণ্টার পর ঘন্টা রুপার মেসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে – মেঘের গান শোনাতে পারে সে কখনো প্রতারণা করতে পারেনা।
শামিমকে সে কোনদিন কোন কিছুতে না করতে পারেনি। নিজেকে সম্পূর্ণ সপে দিয়েছে শামিমের কাছে। কিন্তু শামিমের নম্বর বন্ধ। কোনদিনতো এভাবে নম্বর বন্ধ থাকেনি তার। তার বাড়িতে যেয়েও তাকে পাওয়া গেল না। রুপার আকাশ যেন দ্বিখণ্ডিত হতে শুরু করে। কি হবে এখন। শামিমের মা রুপার সাথে যাচ্ছে তাই দুর্ব্যবহার করেছে। সামান্য একটা সেলস গার্ল। তার কি এমন যোগ্যতা। সপ্তাহ খানেক পড়ে শামিম ফোন করে রুপাকে। কি কথা হয় শামিমের সাথে সেটা সে দ্বিতীয়বার মনে করতে চায়না। কিন্তু চোখের পানিরতো কোন নিয়ন্ত্রণ কারো হাতে নেই। যে মানুষ নিজে থেকে হারাতে চায় তাকে খুঁজে পাওয়া যায়না। শামিমকে দ্বিতীয়বার রুপা জোর করেনা। শুধু বলে,
– ‘ঠিক আছে ভাল থেকো’।
সে তো ভালবাসে শামিমকে। শামিম রুপাকে ছাড়া যদি ভাল থাকতে চায় থাকুক না। কিন্তু তার কি হবে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে থাকে। রাইফেল স্কয়ারে কাপলদের আনাগোনা বেড়ে যায়। তাছাড়া ওয়েটার ছেলেটাও তাগাদা দিয়ে গেছে রুপাকে উঠার জন্য। কিছু না খেলে বসে থাকার মানে নেই।
কিন্তু রুপা কোথায় যাবে? পেটের বাচ্চাকে সে নষ্ট করবে? সিনেমা লেখা হয় জীবনকে নিয়ে কিন্তু জীবন সিনেমার মত চলেনা। ডাক্তারের কাছে যেয়ে টেস্ট করাবে নাকি আরেকবার। রুপার পা ভারী হয়ে আসে। আজকের সন্ধ্যাটা একটু বেশী আধার। রাত হবার আগেই রাত হয়ে গেছে যেন। কাকে দোষ দেবে সে? এ উত্তর তার জানা নেই। মানুষ খুব বিচিত্র। এ শহরে এত এত গলি, এত পথ থাকলেও কোন পথকেই সে আর নিরাপদ ভাবতে পারছেনা।
১৩/০৫/২০২২, ০৯.০০ AM
