অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হলে করণীয়
কয়েকদিন আগে লিন্ডা মারফি নামের মেক্সিকান এক মেয়ে গ্রেপ্তার হয়েছে পুলিশের হাতে। তার অপরাধ হচ্ছে সে তার সাবেক প্রেমিক উইলিয়ামকে এক সপ্তাহের মধ্যে অফিস, বাসা আর ব্যক্তিগত মোবাইলে ৭৭ হাজার ৬৩৯ বার কল করেছে, ১৯৩৭টি ইমেইল, ৪১ হাজার ২২৯টি মেসেজ, ২১৭টি ভয়েস মেসেজ এবং ৬৪৭টি চিঠিও পাঠিয়েছে। বেচারা সাবেক প্রেমিক সাবেক প্রেমিকার অত্যাচারে সপ্তাহে সাতদিন ঘুমায়নি এবং লিন্ডা পুলিশের হাতে আটক হওয়ায় তার উকিল বলেছে,
– তার মক্কেল এতক্ষণে একটু শান্তি পেয়েছে।
ঘটনা আর কিছুই না, পরে জানা গেলো লিন্ডার একটা মানসিক অসুখ আছে। অসুখটার নাম-অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার। এই রোগে আক্রান্তরা মানসিক উদ্বেগে ভোগেন এবং একই কাজ বারবার করে যাওয়া থেকে নিজেকে বিরত করতে পারেন না। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই সমস্যা আছে। সেদিন কথা প্রসঙ্গে এক আপু আমাকে বললেন,
– একদিন তিনি দেখেন ফেইসবুকে তাকে অপরিচিত একজন ১৩৪ বার হাই লিখে পাঠিয়েছে।
তার হাইয়ের ফর্দ দেখতে গিয়ে আপুর হাই উঠে যাওয়ার জোগাড়। আরেক বার দেখেন, অন্য আরেকজন তাকে দুনিয়াতে এহেন গালি নেই যা লিখে পাঠায়নি। আসলে এগুলির প্রতিটাই মানসিক রোগ।
আমাদের দেশে শারীরিক রোগগুলিকে এতো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, কেউ মানসিক ডাক্তারের কাছে গেলেই ফিসফাস ওঠে – এই বুঝি সে পাগল হয়ে গেলো। রোগ নিয়ে লজ্জার কিছু নেই, বরং রোগ লুকানোতেই লজ্জা। কাজেই প্রেমিককে ভালোবাসো ঠিক ততোটা যতটা সে সহ্য করতে পারে। কারোর ওপর অতি নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া মানেই মানসিক দাসত্ব, প্রেম নয়। এবার আসুন জেনে নেয়া যাক অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) সম্পর্কে।
বিষণ্নতা রোগ, ফোবিক ডিসঅর্ডার, মাদকাসক্তির পরেই ক্রমানুসারে আসে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) রোগটির নাম। এটি চিন্তাবাতিকগ্রস্ত ও বাধ্যতাধর্মী আচরণের (শুচিবাই) একটি উদ্বেগজনিত রোগ। সারা বিশ্বে প্রতি ৫০ জনে ১ জন জীবনের কোনো না কোনো সময় এই রোগে ভোগে। সাধারণত শৈশব ও কৈশোরে এই রোগটি শুরু হয়। নারী ও পুরুষ উভয়ই এই বাতিকগ্রস্ততার রোগে ভুগতে পারে।
অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বা শুচিবাই কী?
এটা এমন ধরনের রোগ, যাতে অবসেশন, কমপালশন বা দুটিই থাকতে পারে।
অবসেশন কী?
এটা একধরনের মর্মপীড়াদায়ক চিন্তা, ছবি অথবা তাড়না, যা মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাথায় আসে। এই চিন্তাভাবনাগুলো বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয় এবং কোনো যুক্তির ধার ধারে না।
কমপালশন কী?
অবসেশন দ্বারা তাড়িত বা বাধ্য হয়ে এবং অস্বস্তি ও উদ্বেগ কমানোর জন্য যে কাজ করা হয়, তাকে কমপালশন বলে। যেমন: বারবার ধোয়া, গণনা করা, বারবার যাচাই করা, গুছিয়ে রাখা এবং একই কথা বারবার বলা ইত্যাদি।

যে অবসেশনগুলো সাধারণত দেখা যায় তা নিম্নরূপ।
১. আগ্রাসী অবসেশন
নিজের বা অন্যের ক্ষতি হতে পারে এমন অহেতুক ভীতিকর চিন্তা।
২. সংক্রমণজনিত অবসেশন
শরীর, কাপড়চোপড় বা আসবাবে জীবাণু বা ময়লা লেগে আছে এমন চিন্তা বারবার আসা।
৩. যৌনবিষয়ক অবসেশন
নিষিদ্ধ বা বিকৃত যৌনচিন্তা, দৃশ্য–কল্পনা বা আবেগ। এ ছাড়া সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য সূচক সংখ্যা, বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অথবা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভীতিকর চিন্তা বারবার মনে আসা।
এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের যে কাজগুলো করতে দেখা যায়।
১. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বা ধোয়াবিষয়ক কমপালশন
অতিরিক্ত হাত ধোয়া, টয়লেট বা বাথরুমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা। ঘরের আসবাব ও তৈজসপত্র অতিরিক্ত ধোয়া বা মোছা।
২. পরীক্ষা বা চেক করা বিষয়ক কমপালশন
তালা, চুলা, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি বারবার পরীক্ষা করা।
৩. অন্যান্য
যেমন আসবাব, বইখাতা, কাপড়চোপড় অথবা যেকোনো জিনিস নির্দিষ্ট ছকে গুছিয়ে রাখার প্রবণতা। অকারণে অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমা করে রাখা। বারবার গণনা করা বা কোনো জিনিস বারবার স্পর্শ করা। নিজের ক্ষতি বা অন্যের ভয়াবহ ক্ষতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া।

কেন হয়?
বংশগত কারণ – যাঁদের পরিবারিকভাবে এই রোগের ইতিহাস আছে, তাঁদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা পাঁচ গুণ।
জীবনের কোনো ঘটনা – জীবনের যেকোনো ঘটনা দিয়ে রোগটি শুরু হতে পারে। যেমন: ব্যক্তিজীবনের মানসিক চাপ বা কোনো না কোনো পর্যায়ে যেকোনো চাপ বা ধাক্কা।
রোগজীবাণু – খুব কম ক্ষেত্রে শারীরিক রোগের কারণে এটি হতে পারে। যেমন: স্ট্রেপটোকক্কাল ইনফেকশন, মস্তিষ্কে আঘাত, রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক) ইত্যাদি।
জৈব রাসায়নিক – শরীরে জৈব রাসায়নিক যেমন সিরোটনিন, ডোপামিনের হ্রাস-বৃদ্ধি।
আপনি জানেন কি এই রোগের কারণে রোগীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন বেশ ব্যাহত হয়। দৈনন্দিন জীবনে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। সামাজিক মেলামেশা থেকে রোগী নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। এমনকি রোগী কর্মবিমুখও হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে উদ্বেগ, হতাশা ও অন্যান্য মানসিক রোগ দেখা দিতে পারে। অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ে।
লাইফ হ্যাকিং আরো বেশ কিছু টিপস্ –
- দেহ জ্ঞান তত্ত
- হৃদয়ে গন্ডগোল
- বিবাহ সমাচারঃ প্রীতি মেয়ে
- পুরুষ ও নারী নিয়ে এক ডজন মজারু
- ব্যর্থ প্রেম থেকে উত্তরনের সফল কিছু টিপস
এই রোগ প্রতিরোধে যা করণীয়
১. পর্যাপ্ত ঘুম
২. নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন
৩. সঠিক খাদ্যাভ্যাস
৪. নিয়মিত ব্যায়াম
৫. প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি।
নিম্নলিখিত সিরোটনিনসমৃদ্ধ খাবারগুলো নিয়মিত খাওয়া উচিত
আমিষজাতীয় খাবার: মাংস, কলিজা, ডিম, দুধ, সামুদ্রিক মাছ। ফলমূলজাতীয় খাবার: কলা, আনারস, আম, আঙুর, খেজুর। শাকসবজি: পালংশাক, পুঁইশাক, বেগুন, ফুলকপি, শিমজাতীয় বীজ, মাশরুম, টমেটো, ব্রকলি।
যে খাবার কম খাবেন বা খাবেননা
মিষ্টিজাতীয় খাবার, ক্যাফেইনযুক্ত খাবার যেমন: চকলেট, চা, কফি, কোমল পানীয়, ক্যাফেইনযুক্ত কিছু ওষুধ, অ্যালকোহল ও কৌটায় সংরক্ষিত খাবার।
কোথায় এর চিকিৎসা হতে পারে?
১. অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার ক্লিনিক মনোরোগ বহির্বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)।
২. মনোরোগ বহির্বিভাগ, বিএসএমএমইউ।
৩. জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
৪. সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগ।
এছাড়া প্রাইভেট চেম্বারের মাধ্যমে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ আছে।

ওসিডির জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা
১. ওষুধ যেমন: এসএসআরআই গ্রুপের ওষুধ এবং অন্যান্য
২. সাইকো এডুকেশন রোগী ও পরিবারকে রোগ সম্পর্কে জানানো। রোগীদের চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করতে পরিবার ও বন্ধুদের পরামর্শ দেওয়া।
৩. সাইকোথেরাপি
৪. কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি, গ্রুপ থেরাপি
৫. এক্সপোজার রেসপন্স প্রিভেনশন থেরাপি
৬. রিলাক্সেশন, মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন
কিভাবে বুঝবেন আপনি অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারে ভুগছেন?
১. আপনি কি অতিরিক্ত ধোয়ামোছা করেন অথবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকেন?
২. আপনি কি কোনো কিছু অতিরিক্ত চেক/যাচাই-বাছাই করেন?
৩. আপনার মাথায় অযাচিতভাবে কি কোনো চিন্তা আসে? যা কিনা আপনি চাইলেও মাথা থেকে সহজে বের করতে পারেন না?
৪. আপনার দৈনন্দিন কাজ শেষ করতে কি অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়?
৫. আপনার মধ্যে আসবাব, বইখাতা, কাপড়-চোপড় অথবা যেকোনো জিনিস নির্দিষ্ট ছকে গুছিয়ে রাখার প্রবণতা আছে কি?
উপরিউক্ত প্রশ্নগুলোর যেকোনো একটির উত্তরও যদি ‘হ্যাঁ’ বোধক হয়, তবে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
মনে রাখবেন, অন্যান্য শারীরিক রোগ যেমন: ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ চিকিৎসার মাধ্যমে যেভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, ঠিক তেমনি এই ওসিডি রোগটিও চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এসব আচরণকে স্বাভাবিক না ভেবে কমিয়ে আনতে চেষ্টা করুন। সচেতন হন। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
১৪/০৫/২০২২, ১০.৩০ AM
