গল্পছোট গল্প

বিকৃতি

বিবাহ কার্য সম্পাদন করিতে করিতে রাত্রি হইয়া গেলে বাসর রাত্রি পাত্রীর বাড়িতেই করিবার সিদ্ধান্ত হইলো। এত রাত্রিতে নববধু লইয়া অন্ধকার পথ পাড়ি দেয়া মোটেও শোভনীয় নহে। অমঙ্গল বা জ্বীন ভূতের আছর হইতে পারে। অবশেষে স্বামীর সহিত রাত্রি কাটাইয়া পরদিন দ্বিপ্রহরে রওয়ানা দিয়া পাশ্ববর্তী গ্রাম অম্বরপুরে পৌঁছিলে, সারা গ্রামে রব রব সাড়া পড়িয়া গেল। ছেলে- মেয়ে, নারী -পুরুষ সকলেই ভীড় করিতে লাগিল বরের বাড়িতে। নববধু দেখিতে গ্রামের ছোট বড় কেহই বাদ পড়িলো না।

ঘরের মেঝেতেই মাদুর বিছাইয়া নববধুকে বসানো হইয়াছে। লজ্জায় সারাক্ষণই বড় ঘোমটা টানিয়া নিজের মুখ আড়াল করিতে লাগিলে ননদ বার বার ঘোমটা উঠাইয়া নয়া ভাবীর মুখ দেখাইতে লাগিল।  একবার মুখ দেখাইলে নয়া বধু চোখ বন্ধ করিয়া থাকে, আবার মুখ ঘোমটার আড়াল করে, পুনরায় কেউ আসিলে পুনরায় ঘোমটা উন্মুক্ত করা হইতে লাগিল। কিন্তু সমস্যা তখনই দেখা দিলো। বধু দেখিয়া বাহিরে গিয়া বড়দের পাশাপাশি ছোটরা এমনকি নারীরাও কানাঘুষা করিতে লাগিল।

– “মাশাল্লাহ বউ দেখিতে তো লম্বা চওড়া সুন্দরে একশ এর মধ্যে একশ এক, শুধু ছ্যাদাটাই ছোট।”

আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলে একই কানাঘুষা করিতে লাগিল। কেউ হয়ত কিছু বুঝিয়া করিলো। আর কেউ হয়ত কিছু না বুঝিয়াই সুরে সুর মিলাইতে মিলাইতে পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা করিয়া ফেলিল। নববধু লজ্জায় মরিতে লাগিল। মনে মনে ভাবিলো, “পুরুষ মানুষ এত নির্লজ্জ আর বোধহীন কি করিয়া হয়? আপন স্ত্রীর গোপন কথা সকলের সহিত বলিবার মত এমন হীন কর্ম কিরূপে করিতে পারে?” কিন্তু কাউকে কিছু না বলিয়া লজ্জার বিষ পান করিতে করিতে ভিতর ভিতরে রাগিয়া একাকার হইতে লাগিলো। 

পরের দিনই পিত্রালয়ে বেড়াইতে গিয়া নানী দাদী আর ভাবীদের সহিত সকল ঘটনা বর্ণনা করিলে সকলেই রাগিয়া অগ্নিমূর্তি ধারণ করিলো। নতুন বর তাই কিছু না বলিয়া বরের নানী দাদী ও ভাবীদের নিমন্ত্রণ করিবার ছলে কনের বাড়িতে লইয়া যাওয়া হইলো। কি আর কিভাবে বলিবে সব আগে থেকে মুখস্থ করিয়া বধুর দাদীই শুরু করিলো,
– এমন বেআক্কেল পাত্রের সহিত আর কন্যা দেয়া ঠিক হইবেনা।

ছেলেপক্ষ কারণ জানিতে চাহিলে কন্যার দাদী পুনরায় কহিল,

– “নতুন সবে মাত্র বিবাহ হইয়াছে। এই ছেলের তো একটুও ধৈর্য নাই। ছোট জিনিসকে অতি তাড়াতাড়ি বড় করিবার জন্য উঠিয়া পরিয়া লাগিয়াছে।”

কথার কোনো আগা গোড়া না বুঝিতে পারিয়া ছেলেপক্ষ আবার কহিল,

– “যা কহিবার খুলিয়া কহেন।”

– আমাদের কন্যার আর অন্য কোনো দোষ থাকিলে বলিতে পারিতেন। কিন্তু এই সামান্য কারণে সারা গ্রামের লোক জানাজানির কি কারণ? আপনাদের কি লাজ -লজ্জা, হায়া বলিয়া কিছুই নাই?

– কি হইয়াছে আসল ঘটনা?

পরে নববধু আসিয়া লজ্জার পাড় ভাঙ্গিয়া শুধাইলো। গ্রামের সকলেই নাকি বলিয়াছে,

– “বউ দেখিতে সুন্দর হইলে কি হইবে, ছ্যাদা তো ছোট।”

এবারে পাত্র পক্ষ শুধাইলো,

– “তো কি হইয়াছে ভুল তো কহে নাই ঠিকই তো বলিয়াছে।”

– মানে?

– মানে আপনাদের জামাইয়ের নাম ছৈয়দ। কিন্তু গ্রাম বাংলার নাম বিকৃত করনের বলি হইয়া ছৈয়দ থেকে তাহার নাম ছ্যাদা হইয়া গিয়াছে সেই ছোটকাল হইতে। আর সে তো অনেক খাটো। সেই তুলনায় আপনাদের কন্যা মাশাল্লাহ লম্বা- চওড়া’ সুন্দর। লোকেরাতো ঠিকই বলিয়াছে। বউ লম্বা চওড়া কিন্তু ছ্যাদা কিছুটা ছোট। তাহাতে দোষের কি হইয়াছে? এই ছ্যাদা ছিদ্র নহে এই ছ্যাদা হইলো ছৈয়দ। 

অবশেষে নিজেদের ভুল বুঝিতে পারিয়া সকলে হাসিতে হাসিতে কুটি কুটি হইয়া ছেলেপক্ষের কাছে ভুলবুঝাবুঝির জন্য ক্ষমা চাহিয়া বধুকে রওয়ানা করিয়া দিল। নাম বিকৃত করণ একটি অত্যন্ত জঘন্য অপকর্ম ও অপরাধ। ইহার ফলে কারো সুন্দর নাম যেমন অসুন্দর হয়। তেমনি শুনিতেও কটু লাগে আবার নানারকম ভুলবুঝাবুঝির ঘটনা ঘটিতে থাকে। জানিনা আমাদের বাঙালি জাতি কবে এই নাম বিকৃত করনের অভিশাপ হইতে মুক্তি পাইবে?

২৬/০৫/২০২২, ১০.০০ AM

Kuasha

হয় একদম শেষ অথবা একদম প্রথম, কোন কিছুর মাঝামাঝি থাকা আমার বড় অপছন্দ। আমি স্বপ্ন দেখি তা বাস্তবায়িত করার জন্য। একা থাকা, মুভি দেখা, পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকা ও বই পড়া আমার নেশা। খুব বিরক্ত লাগে পিছনে কিংবা আমার আড়ালে কেউ কথা বললে। লাইফ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে করতে নিজেই কখন যে এক্সপেরিমেন্টাল প্রজেক্টে রুপান্তরিত হয়েছি বুঝিনি। জীবনে অনেক কিছু হতে চেয়েছি। কিন্তু কিছুই হতে পারিনি। তার মানে এই নয় যে আমি ব্যর্থ একজন মানুষ। আমার ব্যর্থতাতেই আমার সফলতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *