অভিজ্ঞতা

ওটা নব্বই দশক ছিলো

বন্ধু আমার জানালো, কোচিং ক্লাস এর পেছনের বেঞ্চে বসা মেয়েটা অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকে। কিছু একটা বলতে চায় মেয়েটা। দুচোখ ভরা কথা। মেয়েটাকে আমি মোটেও পছন্দ করতাম না। পড়া না পারলে স্যার খুব আগ্রহের সাথে ছেলেদের পেছনদিকে জ্বালি বেতের প্রয়োগ করতে পছন্দ করতেন। এসময় মেয়েটা দাত বের করে তাকিয়ে থাকতো। ঘটনা কিছুদিন পর সিরিয়াস লেভেলে চলে গেলো। চুল স্পাইক করা অথবা মোহিকান স্টাইলে কাটা নতুন নতুন শুরু হইসে। বন্ধুর পোশাক পরিচ্ছদ চুল কাটা সবকিছুতেই একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন চলে আসলো কিছুদিনের ভেতর।

কাগজের চিরকুটে বাসার ল্যান্ডলাইনের নাম্বার ততদিনে অদলবদল হয়ে গেছে নিজেদের ভেতরে। ভাইরে, স্কুল জীবনে মোবাইল চর্মচোক্ষে দেখার সুযোগ পাইনি নব্বই এর দশকে। এক বিকেলে বন্ধু কইলো, বিকালে ফার্মগেট থাকবি। কাগজে ঠিকানা লিখে দিলো, যাতে ভুলে না যাই। বিকালে গিয়ে দেখি এলাহি কান্ড। বন্ধু নতুন সাইকেলে বসা। থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট ছেড়ে জিন্স আর টিশার্ট। বাতাসে সুগন্ধি উঁকিঝুঁকি মারছে। ঘটনা শুনলাম। চার্চ থেকে মেয়েটা প্রার্থনা শেষ করে বের হবে মায়ের সাথে। মা যখন রিকশা ঠিক করবে, এক ফাকে আমি যেন হাতে একটা চিরকুট দিয়ে আসি মেয়েটাকে। প্রেম করবি তুই, আমারে টানোস ক্যান এর ভেতরে? আমি কিছুটা পিছপা হলাম।

– দোস্ত, নিজের হাতে এই চিরকুট দেয়ার সাহস নাই আমার। বাট ডিসিশন ফাইনাল। মনের কথা আজ বইলা দিমু।

– ল্যান্ডফোনে তো সারাদিন পকর পকর করস। তখন কইতে পারস নাই?

– দোস্ত, গত মাসে বিল বেশি আসছে। আব্বা ফোন তালা মাইরা রাখে।

ওহে প্রজন্ম, আমাদের গার্জিয়ানরা বহুত সচেতন ছিলো।

– আমি দোস্ত তোর হয়ে চিরকুট দিতে পারুম না। ছেমড়ি চিক্কুর দিলে বাইচান্স, মাইর একটাও মাটিতে পড়বোনা। সবগুলো আমার পিঠের ঊপ্রে পড়বো।

– প্লিজ দোস্ত, কিছু হইবোনা। আমার মত ওরও সেইম কন্ডিশন। আমার নার্ভাস লাগতাসে অনেক। নাহলে আমি নিজেই টান দিয়া ওরে দিয়া আসতাম।

– আমারে মাফ কর মামা। গেলাম।

– চাচা চোউধুরির নতুন দুইটা কমিক্স দিমু। এবারে তো রাজি হ।

চুপ হয়ে গেলাম। শালা ঝানু ব্যবসায়ী। হিসেব নিকেশ করে অফার দিসে। আমিও কম জাইনা। না সূচক মাথা নাড়লাম।

– প্লিজ দোস্ত, সাথে একটা পিংকি।

আবারো মাথা নাড়লাম।

– চলবে না, তোর ব্যাগে ম্যানড্রেক আর ফ্যান্টম দেখসি নতুন। দুইটাই লাগবো।

– তুই একটা ****

গালি দিয়ে বন্ধু রাজি হলো মুখ গোমড়া করে। আমি দাত বের করে বন্ধুর হয়ে চিরকুট দিয়ে এলাম। মেয়ের চোখেও সম্মতির হাসি।

সেদিন পুরোটা রাস্তা বন্ধু সাইকেল নিয়ে রিকশার পেছন পেছন গিয়েছিল। মেয়েটা মাঝেমাঝে আড়চোখে পেছন পেছন তাকাচ্ছিলো। বন্ধুর সবকয়টা দাত বের হয়ে যাচ্ছিল আনন্দে। আমি সাইকেলের পেছনের সিটে বসেও বন্ধুর বত্রিশ পাটি দাত টের পাচ্ছিলাম। এটা নব্বই দশকের প্রেম। এখনকার মতো ফেসবুকে পরিচয়ের এক সপ্তাহের ভেতর ইন এ রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়ে রুমডেট কমপ্লিট করে দুই সপ্তাহ পরে ইন এ কমপ্লিকেটেড রিলেশনশিপ অথবা সিংগেল স্ট্যাটাস দেয়ার মত প্রেম না। সেই প্রেমে হাসি আনন্দ বিরহ বেদনা সব ছিলো।

ফাস্টফুডে সেল্ফি দিয়ে চেকইন ছিলোনা, কিন্তু দুই টাকার বাদাম হাতে প্রিয় মানুষটার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা ছিলো। মোবাইলের বান্ডেল এসএমএস, ফেসবুক, স্কাইপ, ভাইবার, হোয়াটস এপ ইমো ছিলোনা, বাড়িতে মা বাবা ঘুমানোর পর লুকিয়ে কথা বলার জন্য একটা ল্যান্ডফোন ছিলো। হ্যাং আউট ছিলোনা, রুমডেট ছিলোনা, মেকিং লাভ ছিলোনা। ভালবাসার অসাধারণ মিষ্টি মূহুর্ত ছিলো। ভালোবাসার সত্যিকারের একটা অর্থ তখন ছিলো। সত্যিকারের ভালোবাসাই তখন ছিলো। ওহে প্রজন্ম, ওটা নব্বই দশক ছিলো 

২১/০৬/২০২২, ১০.০০ AM

Kuasha

হয় একদম শেষ অথবা একদম প্রথম, কোন কিছুর মাঝামাঝি থাকা আমার বড় অপছন্দ। আমি স্বপ্ন দেখি তা বাস্তবায়িত করার জন্য। একা থাকা, মুভি দেখা, পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকা ও বই পড়া আমার নেশা। খুব বিরক্ত লাগে পিছনে কিংবা আমার আড়ালে কেউ কথা বললে। লাইফ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে করতে নিজেই কখন যে এক্সপেরিমেন্টাল প্রজেক্টে রুপান্তরিত হয়েছি বুঝিনি। জীবনে অনেক কিছু হতে চেয়েছি। কিন্তু কিছুই হতে পারিনি। তার মানে এই নয় যে আমি ব্যর্থ একজন মানুষ। আমার ব্যর্থতাতেই আমার সফলতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *