গল্পছোট গল্প

রঙের নাম ভালবাসা

আমার এক মেয়ে বন্ধুকে দেখতে এসেছে পাত্রপক্ষ। মেয়ের প্রবাসী বাবা ফোনে বললেন,

– ‘মা, ছেলে পছন্দ হয়েছে?’
মেয়ে বলল,

– ‘না’।
বাবা বললেন,

– ‘কেন? ছেলে উচ্চ শিক্ষিত, ভাল জব করে, বংশ ভাল, আচার ব্যবহার চরিত্র ভাল’।
মেয়ে বলল,

– ‘ছেলে কালো বাবা’।
বাবা বললেন,

– ‘আমিওতো কালো, কালো বলে আমাকে বাবা বলতে খারাপ লাগে? তোমার মা আমার মত কালোমানুষকে বিয়ে করে ভুল করেছে?’

মেয়ে কথা বলল না, সে চুপ করে রইল।

ছেলেদের ফর্সা রং প্রীতির মানসিকতার সমালোচনায় মেয়েদের নানান উচ্চকিত কণ্ঠ শুনি আশেপাশে। কিন্তু ঘটনার উল্টো উদহারনও আছে। আসল ব্যাপার হল ক্ষমতা। যেখানে যার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকে সে সেখানে ততটাই ‘স্বেচ্ছাচারী’ হয়। অন্যের বিষয়ে ততটাই ‘চুজি’ হয়। একবার শহুরে আন্টিদের এক আলোচনা শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে এক আন্টি অন্য আন্টিদের বলছিলেন,

– ‘দেখছেন ভাবী, অমুকের ফর্সা, সুন্দর মেয়েটারে অইরকম কালা একটা ব্যাটার সাথে বিয়া দিছে! কুচকুইচ্যা কালা। টাকার লোভ, টাকা! টাকা!’
অন্য আন্টি বললেন,

– ‘বেশি কালা?’
আগের আন্টি বললেন,

– ‘না, বেশি না, তবে আরেকটু ফর্সা হইলেই নিগ্রো হইতে পারত। হাহাহা!

দুর্দান্ত সেন্স অফ হিউমার, ‘আরেকটু ফর্সা হইলেই নিগ্রো হইতে পারত”! পুরো আড্ডা অট্টহাসিতে ভেঙে পরল। এর চেয়ে বড় আনন্দ যেন আর নেই। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। হাসতে হাসতে অনেকের চোখেই পানি চলে আসছে। আমার তাদের কোন একজনকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছিল,

– ‘আচ্ছা, আপনার সন্তান যদি কালো হয়?’

আমি জানি না তিনি কি উত্তর দিতেন, তবে আমার ধারণা, জগতের সকল বাবা মায়ের কাছে তার সন্তান সুন্দর, জগতের সবচেয়ে সুন্দর মুখ। সবচেয়ে মিষ্টি চেহারা। সম্ভবত চৈনিক রূপকথা। প্রচণ্ড ঝড়ে একটা পেঁচা তার ছোটছোট বাচ্চাকাচ্চাসহ এক গাছের কোটরে ঢুকে পড়ল। ঢুকে দেখে সেই কোটরে আরও অনেক পাখি, তাদের ছানাপোনারা। ভোরে ঝড় থামল। সারারাত কিছু খাওয়া হয় নি। সব পাখিরা বাচ্চাকাচ্চা রেখে বের হল খাবার সংগ্রহে। সবার শেষে বের হল পেঁচা। বের হতে গিয়ে দেখে, কোটরের মুখে বিশাল এক অজগর। পেঁচা অনেক অনুনয় বিনয় করল। কান্নাকাটি করল। সব শুনে অজগরের মনে মায়া হল। সে বলল, – আচ্ছা, তুমি যাও, আমি তোমার বাচ্চাদের খাব না।’

পেঁচাতো দারুণ খুশি। অজগর হঠাৎ বলল,

– ‘কিন্তু তোমার বাচ্চাদের চিনব কি করে?’
পেঁচা বলল,

– ‘ওই কোটরের সবচেয়ে সুন্দর যেই বাচ্চাগুলো সেগুলো আমার। আর কুৎসিতগুলো অন্যদের। কুৎসিতগুলো খেয়ে ফেল’।

পেঁচা খুশি মনে চলে গেল। দিন শেষে খাবার নিয়ে ঘরে ফিরল। ফিরে দেখে, আর সকল বাচ্চারাই আছে, শুধু তার বাচ্চারাই নেই। সে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে অজগরের কাছে গেল, গিয়ে বলল,

– ‘তুমি আমার বাচ্চাদের খেয়েছ?’
অজগর বলল,

– ‘নাতো, আমিতো তোমার কথামত সবচেয়ে কুৎসিত বাচ্চাগুলোকে খেয়েছি।’
পেঁচাতো আর জানে না, তার মত মায়ের চোখে তার সন্তানদের আর কে দেখবে!

আমার নানু বাড়ির ‘কাইল্লা’ জাহাঙ্গির ছিল কালো, কুচকুচে কালো, তার মা বাবা অনেকদিন বেঁচে ছিলেন, বৃদ্ধ বয়সেও তাকে ডেকে বলতেন,

– ‘আমার কালামানিক, ও আমার কালামানিক। একটু বুকে আয় বাপধন, তোর সোনা মানিক মুখখান একটু দেখি! পরানডা জুড়াই।’
অথচ জগতের আর সকলের কাছে সে ছিল ‘কাইল্লা জাহাঙ্গীর’। আহা, মা। আহা বাবা! দুনিয়াটা অদ্ভুত। অদ্ভুত বলেই অমন মমতাময়ী মা বাবারা সকলের মা বাবা হতে পারেন না। হলে হয়ত জগৎটা অন্যরকম হত। অন্যরকম। সেখানে কালো আর ফর্সা নয়, রং একটাই। সেই রঙের নাম মমতা, সেই রঙের নাম ভালবাসা।

২৬/০১/২০১৭, ১১.০৩ AM

N-Desk

ন্যাশনাল ডেস্ক যা কোথাও কোথাও N-Desk নামেও পরিচিত। এই ডেস্ক থেকে অবিনশ ব্লগে বাংলাদেশের চলমান ঘটনা তুলে এনে পেশ করা হয়ে থাকে। আপনিও চাইলে বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে আমাদের লিখে পাঠাতে পারেন সম্প্রতি ঘটে যাওয়া যে কোন তথ্য কিংবা ঘটনা সম্পর্কে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *