গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-২)
পাঁচ
দুপুরে খেতে বসে শামীম আর শুভ একই সাথে চিৎকার করে ওঠে, “এসব কি মা?” শিরিন সুলতানা কিছু বলার আগেই পরী দৌড়ে এসে বলল,
– খালাম্মা আপনের বড় ছেলেরে বলছিলাম বাজারে যাইতে সে যায় নাই এখন তো এগুলাই খাইতে হইব।
শুভ বলল,
– তাই বলে মূলার ভর্তা আর মূলার ভাজি? আম্মু আজ ছুটির দিন, কোথায় ভালো কিছু খাবো, তা না। আর কিছুই কি ছিল না?
পরী বলল,
– ছোট ভাইজান, আমি তো আর আপনের ভাবী লাগিনা যে আপনের ভাইরে কানে ধইরা বাজারে পাঠামু তারপর পোলাউ কুরমা রাইন্ধা দিমু।
শামীম বলল,
– এই তুমি মুখ সামলে কথা বলো। কি বলছ এসব? আর বাজারে যেতে পারিনি বলে তুমি এসব রান্না করবে? তোমাকে পন্ডিতি করতে কে বলছে? আম্মুকে জিজ্ঞেস করতে পারোনি? আসলে এগুলো সব তোমার শয়তানী বুদ্ধি ছাড়া কিছুই না। আম্মু তুমি একে কিছু বলছ না কেন?
শিরিন সুলতানা কিছু বলার আগেই পরী চেঁচিয়ে উঠিল,
– আপনের আম্মা কি বলব? সেই তো বলল, যা ইচ্ছে হয় রান্না কর, তাই তো করলাম। এখন এত কথা!
শিরিন সুলতানা অবস্থা বেগতিক দেখে বলল,
– আচ্ছা ঠিক আছে তোমরা এখনকার মত খেয়ে নাও আমি দেখছি পরে কি করা যায়।
মুখ প্যাঁচার মত করে রাগে গজগজ করে ছেলেরা খাওয়া শুরু করে। শামীম বলল,
– মেয়ে বলে কিছু বললাম না, ছেলে হলে ওর মুখ ভেঙে দিতাম। ফাজিল কোথাকার।
ওদিকে পরী রান্নাঘরে গিয়ে মুখ চেপে সেই হাসি।
ছয়
শামীমের গাছের খুব নেশা আছে। তার ঘরের বারান্দা আর ছাদে বেশ কিছু গাছ লাগিয়েছে সে। এই জায়গাগুলো তার ভীষণ প্রিয়। বিকেলটা প্রায় সময় সে এখানেই কাটায়। বিকেলে চা আর গাছের সাথে সময় কাটানো তার প্রিয় অভ্যাস। আজও বিকেলে ছাদে এসেছে। পরীর কাছে চা চেয়ে আবার কোন ঝামেলা হয় সেই ভয়ে চা ছাড়াই ছাদে এসেছে কিন্তু এখন চায়ের জন্য তার মন উশখুশ করছে। ঠিক সেই সময়ে তার সামনে চুড়ি পরা একটা হাত চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়। তাকিয়ে দেখে পরী। সে ধন্যবাদ বলতে গিয়ে মূলার কথা মনে পড়ায় ধন্যবাদটা চেপে যায়। পরী বলল,
– আপনের তো অনেক গাছ, আমারও গাছের অনেক সখ। কি সুন্দর লাল গোলাপের গাছটা! ওইটা আমারে দিয়া দেন না?
শামীম বলল,
– অসম্ভব, তোমাকে গাছ দিব? কক্ষনো না। একদিনে যথেষ্ট মেজাজ খারাপ করেছ আমার, এখন যাও এখান থেকে।
পরী বলল,
– গাছ না নিয়া তো আমি যাব না। গাছ যাদি না দেন এক্ষণ আপনের আম্মারে গিয়া বলবো আপনে ছাদে উইঠা পাশের বিল্ডিং এ যে নতুন মাইয়াটা আসছে তার সাথে প্রেম করেন। আমারে নিজে এইসব বলছেন।
শামীম প্রমাদ গুনল, এই মেয়ে এত ডেঞ্জারাস! কি বলছে এসব? শামীম বলল,
– তোমার মত মিত্থ্যুকের কথা আমার মা বিশ্বাস করবে তার কোন কাজ নেই যেন, না?
পরী বলল,
– অবশ্যই বিশ্বাস করবে কারণ, আমি আরও বলবো, এগুলা সব পাশের বাড়ির আফাও আমারে বলছে। খালাম্মায় তো আর এইসব খোঁজ কইরা দেখতে যাইব না। আর আমারে যে এত কথা বলাইতেছেন সেই জন্য বোনাস হিসেবে বলবো, আপনের মোবাইলে আমি একটা মাইয়ার ফডু দেখছি। দেখতে একদম পাশের বাড়ির আফার মতন।
শামীম দেখল এই মেয়ে শুধু শয়তানী জানে তাই নয় মহা ধড়িবাজ। সে রাগে গজগজ করতে করতে গাছটা তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। পরী মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল,
– থাংকু জান।
শামীম বলল,
– এই কি বললে তুমি?
পরী বলল,
– কেন থাংকু ভাইজান বলছি, আপনে কি শুনছেন?
শামীম আর কথা না বাড়িয়ে কাজে মন দেয়। পরী বলল,
– আপনেগো বাসায় কাজ কইরা ভালোই লাগল। মন চাইতাছে প্রত্যেকদিন আসি। কি আসবো?
শামীম বলল,
– অসম্ভব, তুমি একবারে বিদেয় হবে। আর কোনদিন যেন তোমার চেহারা না দেখি।
পরী বলল,
– এমন করেন কেন? বেশি রাগ হওন ভালো না। নাইলে দেখবেন আল্লায় এমন করছে যে প্রত্যেকদিন আপনার আমার চেহারাই দেখন লাগল!
শামীম বলল,
– প্রয়োজনে কাজের লোক রাখব না, তবু তোমাকে আর দেখতে চাই না। বুঝেছ? যাও ভাগো এখন।
পরী হাসতে হাসতে চলে যায়।
শামীম মনে মনে বলল, এই মেয়ে একদিনে যে পরিমাণ তান্ডব চালিয়েছে এক সপ্তাহ থাকলে নির্ঘাত আমাকে পাবনা যেতে হবে। শাঁকচুন্নির নানী একটা। আমার পছন্দের গাছটা ডাকাতি করে গেলি। যা তোর বিয়ে হবে একটা রাগী মোটা হাতি মার্কা গরিলার সাথে। আর তোকে তিনবেলা খাওয়াবে মূলার জুস, ভাজি আর ভর্তা।
নিচের গল্প গুলো পড়ে দেখতে পারেন –
সাত
শিরিন সুলতানা রাতের খাবার খেতে ছেলেদের ডাকে। দুপুরের কথা ভেবে ছেলেরা প্রচন্ড অনিহা নিয়ে খেতে আসে কিন্তু টেবিলে বসতেই তাদের চোখ চকচক করে ওঠে। দুইভাই একসাথে চেঁচিয়ে ওঠে, “বিরিয়ানি!” এদের দুই ভাইয়েরই বিরিয়ানি ভীষণ পছন্দ। দুপুরে পেট ভরে খাওয়া হয়নি বলল দুজনই রীতিমত খাবারের উপর হামলে পরে। খেতে খেতে দুজনই বলল,
– আজকের বিরিয়ানিটা অসাধারণ হয়েছে।
শিরিন সুলতানা বলল,
– তার মানে আমার বিরিয়ানি ভালো হয় না বলছিস?
শুভ বলল,
– মানে? আজ তুমি রান্না করোনি?
শিরিন সুলতানা বলল,
– না, আজ পরী রান্না করেছে। সে দুপুরে মূলা খাইয়েছে বলে রাতে তোদের জন্য বিরিয়ানি করে গিয়েছে। আমার তো মনে হল রান্না ভালো হয়নি!
শুভ বলল,
– নো মম, আজকের বিরিয়ানি যাস্ট ওয়াও হয়েছে। মূলার জন্য পরীকে যেই স্পেশাল গালাগাল গুলো দিয়েছিলাম তা ক্যান্সেল করে দিচ্ছি। পরীর বিরিয়ানি রান্নার হাত অসাধারণ। আম্মু মাঝে মাঝে পরীকে বিরিয়ানি রান্নার জন্য দাওয়াত করো তো।
শামীম চেঁচিয়ে ওঠে,
– অসম্ভব। ওই শাঁকচুন্নির নানী যেন এ বাড়িতে আর না আসে। মহা ধড়িবাজ একটা।
শুভ বলল,
– ধড়িবাজির কি করল আবার?
শামীম গোলাপ গাছের বিষয়টা চেপে গেল, বলবেই বা কীভাবে? তাই বলল,
এই গল্পের বাকি পর্বগুলো পড়ুন –
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব- ১)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব- ৩)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব- ৪)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-৫)
- গল্পটা তোমার আমার (পর্ব-৬)
- গল্পটা তোমার আমার (শেষ পর্ব)
– দেখলি না কেমন মূলা খাইয়ে গেল?
শুভ বলল,
– সেটা তো তোমার ভুলের জন্য। আর সে জন্যই তো এত ভালো আয়োজন দেখছি এখন। আহা ভুল থেকে দেখছি আসলেই দারুণ কিছু হয়! তাহলে তো ভাইয়া তোমার আর বাজারে না যাওয়াই ভালো।
শামীম বলল,
– হুম তারপর রোজ মূলার ভর্তা দিয়ে ভাত খেও, ওয়াও হবে তাই না?
শিরিন সুলতানা বলল,
– শুধু বিরিয়ানি না, তোর পছন্দের কাবাব আর পায়েসও করে গেছে।
শুভ বলল,
– আহ এই মেয়ে তো আসলেই দারুণ। কিন্তু সবই তো দেখছি ভাইয়ার পছন্দের, আমার জন্য কিছু করে নাই নাকি?
শামীম বলল,
– তোর জন্য আবার কি করবে? যা ভাগ।
শুভ বলল,
– ছোট বলে সব সময় আমার বেলায় কম, এই জন্যই বলি একজন পার্টনার দরকার। পার্টনার থাকলে আজ আর এই দিন দেখতে হত না, হুহ। তা আমার জন্য পার্টনার কবে খুঁজবে বলো তো? গ্রুপ স্টাডির জন্য রেজাল্ট খারাপ হলে তখন কিন্তু আমায় কিছু বলতে পারবে না।
শামীম বলল,
– দেখেছ মা তোমার ছেলে কেমন পেকেছে?
শিরিন সুলতানা বললেন,
– তুই কবে পাকবি সেটা বল না?
শামীম বলল,
– এই শুরু হবে এখন তোমার… আহা বিরিয়ানির স্বাদটা ভালো করে নিতে দাও না?
ডিনারের পর পায়েস খেতে খেতে শামীমের মনে হলো, পরীর রান্নার হাত আসলেই দারুণ। মেয়েটা এতটাও খারাপ বলে মনে হচ্ছে না… আর তখনই তার গোলাপ গাছটার কথা মনে পড়ে গেল! আর মনে মনে বলল, “শাঁকচুন্নির নানী।”
[চলবে]
০২/০৪/২০২২, ১০.১০ PM
