গল্পছোট গল্প

এক মুহূর্ত

সময়: মধ্যরাত 
জগরুল ওরফে জগা ড্রাইভার মাতাল হয়ে টলতে টলতে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। আকাশে চাঁদ তখন ঠিক মাথা বরাবর। চারদিক দিনের আলোর মত পরিষ্কার আর সুনসান নীরবতা। মাঝে মাঝে গাছের আড়াল থেকে পেঁচার ডানা ঝাপটানোর শব্দ হাঁড় কাঁপিয়ে দেয়। জগা ড্রাইভারও ভয়ে ঘেমে উঠছিল। তাই তাড়াতাড়ি পা চালাচ্ছিল কিন্তু তার মনে হচ্ছিলো রাস্তা যেন ফুরোচ্ছে না। বাতাসে গাছের পাতার সর্ সর্ শব্দ একটা আর্ত ডাকের কথা বারবার তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলো। যে ডাক থেকে পালিয়ে বাঁচতেই সে আজ অনেক মদ গিলেছে। কিন্তু ডাকটাকে মাথা থেকে কোনভাবেই সরাতে পারছেনা। হাঁপাতে হাঁপাতে একসময় বাড়ির দোরগোড়ায় এসে সে ধপাস করে পড়ে যায় সেখানে আরামে লেজ গুটিয়ে ঘুমিয়ে থাকা কুকুরের উপর। দুজনেই ভয়ে পড়িমড়ি শব্দ করে উঠে।

পরে বুঝতে পেরে জগা ড্রাইভার কুকুরটাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে তাড়িয়ে দেয়। এসব শব্দে জগা ড্রাইভারের বউ ময়নার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমন্ত ছোট ছেলেটাও কেঁদে উঠে কাঁচাঘুম ভেঙে যাওয়ায়। পরে বাবার গলা শুনতে পেয়ে ‘বাবা’ ডাক দিতে থাকে। জগা ড্রাইভার তখন পাগলের মত হয়ে যায়। মুখের ভাষা আরো খারাপ করে গালিগালাজ করতে থাকে বউ আর বাচ্চার উপর। ‘বাবা’ ডাকটা তাকে দানবের মত করে তোলে। ময়না অনেক কষ্ট করে তাকে থামায়। একসময় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে আর সে বলতে থাকে,

– বাবা ডাকবিনা। 

ধীরে ধীরে জ্বরের প্রকোপ বাড়ায় ছেঁড়া ছেঁড়া অনেক কথা বলতে থাকে সে। আর নিজের বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে থাকে। ময়নাকে বলে,

– সাবধান ওকে রাস্তায় অথবা ঘরের বাইরে যেতে দিবানা। কখনো না। 

ময়না কিছুই বুঝতে পারেনা, শুধু কাঁদতে কাঁদতে জগরুলের মাথায় পানি ঢালতে থাকে। জগরুল আবার বলে,

– কাউকে আমার কথা বলবানা। আমাকে আর আমার ছেলেকে লুকিয়ে রাখো, লুকিয়ে রাখো।  
সময় : সকাল ১১টা। 
যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে যানজটে সবাই বিরক্ত। ঘন্টাখানিক পরে ধীরে ধীরে যানজট ছাড়তে থাকে। একটা ট্রাক হঠাত্‍ করে একটা অটোরিক্সার সাথে হালকা ধাক্কা লাগে। দুই ড্রাইভারই নিকৃষ্ট ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। ট্রাক ড্রাইভার বেশি বিরক্ত হয়ে উঠে। মারতে যায় অটোরিক্সা ড্রাইভারকে। ট্রাফিক পুলিশ এসে থামায়। তারপর ট্রাক ড্রাইভারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জরিমানা নেয় তার কাছ থেকে। রাগী ট্রাক ড্রাইভার মাথা গরম করে গাড়ী চালানো শুরু করে উল্টোপাল্টাভাবে। শনির আখড়ার যানজটমুক্ত রাস্তায় ট্রাকটা যাচ্ছিলো অনেক তাড়াহুড়ো করে। ট্রাক ড্রাইভার তখন রাগে অন্ধ ছিল। সেই সময় রাস্তা কাঁপিয়ে শুধু শোনা যায় একটা ‘বাবা’ ডাক। স্কুল ফেরত দুটো ছেলেমেয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলো, রাস্তার অপরপাশে তাদের বাবা বলছিলো,

– আগেই এসোনা। আমি আসছি। 

বাচ্চা দুটো তা না শুনেই দৌঁড়ে রাস্তা পার হচ্ছিলো। সেই সময়েই একটা ট্রাক একটা বাচ্চার উপর দিয়ে যায়, আরেকটা বাচ্চা ছিটকে দূরে পড়ে যায়। ট্রাক ড্রাইভার, জগা আকাশ বাতাস কাঁপানো ‘বাবা’ ডাক শোনার কিছুক্ষণ পর হুঁশ ফিরে পায়। পাবলিক জড়ো হবার আগেই সে এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে গাড়ি চালাতে শুরু করে দ্রুত, অনেক দ্রুত। ভূতে পাওয়া মানুষের মত তখন পালাতে চায় সে। নরসিংদীর কাছে গিয়ে সে গাড়ি রেখে বন্ধুদের আড্ডা তে যায়, সব ভোলার জন্য মদ গিলতে। তারপর নিজেকে লুকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে, তবে ঐ ‘বাবা’ ডাকটা তাকে পালাতে দিচ্ছিলো না তার বিবেকের কাছ থেকে।

০৮/০৬/২০২২, ১০.০০ AM

N-Desk

ন্যাশনাল ডেস্ক যা কোথাও কোথাও N-Desk নামেও পরিচিত। এই ডেস্ক থেকে অবিনশ ব্লগে বাংলাদেশের চলমান ঘটনা তুলে এনে পেশ করা হয়ে থাকে। আপনিও চাইলে বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে আমাদের লিখে পাঠাতে পারেন সম্প্রতি ঘটে যাওয়া যে কোন তথ্য কিংবা ঘটনা সম্পর্কে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *