আন্তর্জাতিক

ইউক্রেনীয় শিশু ও যুদ্ধকালীন মানসিক আঘাত

ইউক্রেন থেকে পালিয়ে আসা বাচ্চাদের জন্য, যুদ্ধকালীন মানসিক আঘাত দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত রেখে যেতে পারে তাদের কোমল মনে, ধারনা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের। স্বেচ্ছাসেবকরা অনলাইন কাউন্সেলিং, আর্ট থেরাপি, এবং বিশ লাখের ও অধিক ইউক্রেনীয় শিশু যারা এই যুদ্ধকালীন সময়ে উদ্বাস্তু হয়েছে তাদের মানুষিক চাপ উপশমের জন্য ছুটে এসেছে।

ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখ, মারিয়া মাজিরা-মার্তোস গোলাগুলির শব্দে জেগে ওঠে দেখেন রাশিয়া ইউক্রেনের উপর আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে। সে সময় নষ্ট না করে একটি ব্যাগে কয়েকটি কাপড়, ওষুধ এবং দুটি বিড়াল নিয়ে, দ্রুততার সাথে ৪১ বছর বয়সী তার স্বামী এবং তিন সন্তানের সাথে একটি ছোট গাড়িতে উঠে কিইভ ছেড়ে চলে যান। কিন্তু পশ্চিম ইউক্রেনে তাদের আগমনের পরপরই বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। তারা এই প্রথম অনেক নিদ্রাহীন রাত কাটিয়েছেন গাদাগাদি করে খুবকাছের এক বন্ধুর বাড়ির বেসমেন্টে, সাথে আরো অনেক বাস্তুচ্যুত পরিবারের সাথে আড্ডা দিয়ে।

শিশুদের ইউক্রেন পরিত্যাগ
শিশুদের ইউক্রেন পরিত্যাগ

পরের দিন, মারিয়া মাজিরা-মার্তোস মানসিক চাপ আরও বেড়ে গেল। তার ১৩ বছর বয়সী মেয়ে, মাজা’র শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, সেই সাথে তার পা কাঁপছিল এবং তার হৃদপিন্ডের কম্পন বেড়ে যাচ্ছিল। “বাহিরে অনেক গোলমাল ছিল এবং আমি অনুভব করতে লাগলাম যে, আমি চেষ্টা করেও এই ভয়ংকর অনুভূতিগুলি কাটিয়ে উঠতে পারি না। যে কোন সময়, আমাদের সাথে খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে এবং আমি জানি না আমাদের ভবিষ্যতে কী হবে,” মাজা অতিত দিনের স্মৃতি স্মরন করে। “যখন আমি বুক ভরে শ্বাস নেয়ার জন্য চেষ্টা করি, আমি আমার চোখ বন্ধ করলেই বোমার বিস্ফোরণ দেখতে পাই, আর তখনই আমার শ্বাস কষ্ট শুরু হয়।”

মাজা’র এই প্যানিক অ্যাট্যাক এক ঘন্টারও বেশি সময় ধরে ছিল। “আমি সত্যিই জানতাম না, এই পরিস্থিতিতে আমার কি করা উচিত কারণ আমি প্রথমবার এরকম কিছু অনুভব করেছি,” তার মা বলে। মাজার গডমাদার (ধর্মমাতা), যিনি একজন মনোবিজ্ঞানী এর সাথে ফোনে কথা বললে জানান, এই সময়গুলোতে শিশুদের স্ট্রেচ এবং ব্যায়াম, আলিঙ্গন খুব কাজে সেয়। মাজা বলেন, “আমার মনোবিজ্ঞানীর দেয়া পরামর্শগুলো এই সময়ে স্বাভাবিক থাকতে অনেকটাই সাহায্য করেছে এবং তিনি বলেছেন যে এটা স্বাভাবিক।”

প্রায় বিশ লক্ষ শিশু ইউক্রেন থেকে পালিয়ে গেছে, যার বেশিরভাগই তাদের মা এবং দাদা-দাদির সাথে। কারণ ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি নেই এবং তাদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হতে পারে। এই শিশুদের শুধু বাবাই নয়, তাদের বন্ধু, পোষা প্রাণী এবং খেলনাও রেখে যেতে হয়েছে। যুদ্ধের ডামাডোল যখন কমে যেতে শুরু করে এবং সেই সকল শিশুদের প্রধান আশ্রয়স্থল হয়েছে বেসমেন্ট কিংবা বোমা শেল্টারে ধ্বংস প্রায় ভবন গুলোতে। তারা কঠিন যাত্রার পরে ক্লান্ত হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু ঠিক মত ঘুমা হয় না কিংবা খেতে ইচ্ছে করে না।

শিশুদের চিত্র কর্মশালা
শিশুদের চিত্র কর্মশালা

শিশুদের মাঝে যুদ্ধপরবর্তি এই এগুলি মানসিক আঘাতর লক্ষণগুলি নিজে থেকেই প্রকাশ পেতে শুরু করে। আর এ থেকে উত্তরনের লক্ষে সাহায্য করার জন্য, স্বেচ্ছাসেবক এবং দাতব্য সংস্থাগুলি ইউক্রেনের শিশুদের মাঝে কিছুটা স্বাভাবিকতা প্রদানের জন্য অনলাইন থেরাপি বা শিল্প এবং খেলার বস্তু প্রদানের জন্য ছুটে আসছে। তারা ইউক্রেনের সীমান্ত এলাকায় শিশুদের মাঝে এ খেলনা বিতরণ করছে। আপরদিকে পোল্যান্ড এবং মোল্দোভায় পেশাদার ক্লাউনের দল শিশুদের প্রত্যাবর্তনে উল্লাস করছে।

সাংবাদিক এবং ভয়েস অফ চিলড্রেন-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আজাদ সাফারভ বলেছেন, “থেরাপি দেওয়ার জন্য এটি একটি আদর্শ পরিস্থিতি নয়। দাতব্য সংস্থাটি ইউক্রেনীয় শরণার্থী কেন্দ্র এবং এতিমখানাগুলিতে মনস্তাত্ত্বিক যত্ন এবং অঙ্কন সেশনের সমন্বয় করে, বাস্তুচ্যুত শিশুদের যুদ্ধের বাস্তবতা মোকাবেলার উপায় হিসাবে অঙ্কন চিত্র এবং খেলনার ব্যবহার করে শিশুদের মনবিকাশ উন্নয়নে সহায়তা করবে। তাদের এই ধরনের আর্ট থেরাপি প্রোগ্রামগুলো ২০১৫ সালে ডোনেটস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে সংঘর্ষের প্রতিক্রিয়াইয় শিশুদের মানষিক বিকাশের অংশ হিসাবে চালু করা হয়েছিল।”

সাধারণত, এই প্রোগ্রামগুলি ১০ সপ্তাহ স্থায়ী হয় এবং একজন মনোবিজ্ঞানীর নেতৃত্বে হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমান শরণার্থী সঙ্কটের প্রথম সপ্তাহগুলিতে, সাফারভ বলেছেন, ক্রমাগত বা পৃথক থেরাপি প্রদান করা কঠিন ছিল, কারণ শিশুরা প্রায়শই আসা যাওয়ার মধ্য দিয়ে ছিলো। কিন্তু এখন যেহেতু তারা সেন্ট্রাল এবং পশ্চিম ইউক্রেনের কেন্দ্রগুলিতে বসতি স্থাপন করেছে, সেহেতু চিত্রাঙ্কন এবং কাউন্সেলিং সেশনগুলি সাপ্তাহিক ভাবে নেয়া হচ্ছে। “এর মানে এই নয় যে আমরা শুধু এসবের মাধ্যমেই সব বাচ্চাদের নিরাময় করবো। এটি তাদের স্থিতিশীল করার জন্য, তাদের শান্ত করার জন্য, তাদের মন থেকে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ,” বলেছেন সাফারভ৷

শিশুরা যা দেখে তাই আঁকে
শিশুরা যা দেখে তাই আঁকে

যেখানে শিশুরা সাদা কাগজে বাবা-মা, বাড়ি এবং গাছ আঁকত, এখন তারা বোমা, ট্যাঙ্ক এবং অস্ত্র আঁকে। সাফারভ বলেছেন যে, শিশুরা তাদের মনে যা আছে তাই আঁকে, এমনকি তারা তাদের পিতামাতার সাথে এ সম্পর্কে কোন আলোচনা করে না। উদাহরণ স্বরূপ, তিনি বলেছেন, সমস্ত বাস্তুচ্যুত শিশুরা গোলাগুলির অভিজ্ঞতা না পেলেও, তারা প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে যা শুনেছে তার উপর ভিত্তি করে তারা সে সম্পর্কে ছবি আঁকতে পারে। তিনি বলেছেন।

নোসিক একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, যিনি এর আগে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলির সাথে কাজ করেছিলেন যারা ২০১৪ সালে রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরে দক্ষিণ-পূর্ব থেকে পালিয়ে গিয়েছিল৷পরবর্তিতে রাশিয়ার পূর্ণ-আক্রমণের মুখে এই পরিবারগুলির মধ্যে অনেককে দ্বিতীয়বারের মতো তাদের বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়েছিল৷

তার কাউন্সেলিং সেশনে, নোসিক মৃত্যু বা মৃত্যুহারের উপর অত্যধিক জোড় দেননি, বরং তিনি আশা করেন যে যুদ্ধ অঞ্চল থেকে আরও বেশি শিশু লভিভে আসার সাথে সাথে তাদের মানষিক বিকাশের পরিবর্তন হবে। “আমি ফিরে আসা শিশুদের মাঝে বেশ কিছু আচরণগত সমস্যা দেখতে পাচ্ছি, যেমন আগ্রাসন মনোভাব এবং মানসিক স্থিতিশীলতার অভাব, এবং এ সকল উপসর্গের শিশু দলটি হতাশার সাথে যুক্ত,” সে বলেন।


ইউক্রেন সম্পর্কে অন্যান্য লেখা পড়ুন –


শিশুদের মন অত্যন্ত নরম হবার কারনে তাদের মনে যুদ্ধের খারাপ দিকগুলোর প্রভাব পড়তে পারে। বয়স্ক শিশুরা যুদ্ধের অর্থ কী তা বুঝলেও, তারা তাদের মানসিক যন্ত্রণা দূর করতে অক্ষম। ২০১৬ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনিক্যাল গবেষক দল সিরিয়ায় শরণার্থী শিবিরে দুই বছর কাটান এবং ১৩১ সিরীয় শিশুর উপর জরিপ করেছেন। তাদের অর্ধেক উচ্চ মাত্রার উদ্বেগ দেখিয়েছিল, এবং প্রায় ৮০ শতাংশের ভেত বিচ্ছেদের উদ্বেগ ছিল। মূলত তারা এতটাই ভীত ছিল যে তারা তাদের পিতামাতার পাশে থাকতে পারেনি।

যুদ্ধপরবর্তি শিশুদের ইউক্রেনে প্রত্যাবর্তন
যুদ্ধপরবর্তি শিশুদের ইউক্রেনে প্রত্যাবর্তন

কোনও মেয়েই পোস্ট-মানসিক আঘাতটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) এর মানদণ্ড পূরণ করেনি, তবে ৯.১ শতাংশ ছেলেদের ভেতর যে লক্ষণ গুলো দেখা গিয়েছে তা হলো, যেখানে তারা ফ্ল্যাশব্যাক এবং দুঃস্বপ্নের মাধ্যমে আঘাতমূলক ঘটনাগুলি পুনরায় তাদের মানষপটে ফিরে আসে।

শিশুরা প্রায়শই তাদের মায়ের প্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে নিজেদের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করে, তবে তার মানে এই নয় যে, এই শিশুদের মায়েরাও PTSD-এর সমস্যায় ভুগছেন। যদিও এই পরিসংখানের পরিসর ছোট ছিল, তবে এর ফলাফলগুলি পশ্চিমা দেশগুলিতে পুনর্বাসিত শরণার্থী শিশুদের অন্যান্য সমীক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শিশু মনোবিজ্ঞানী নোসিক বলেছেন, সমস্ত ইউক্রেনীয় শিশু যারা মানসিক আঘাত অনুভব করেছে তারা PTSD-তে আক্রান্ত হবে না। যুদ্ধের শুরুতে যারা বাবা-মা উভয়ের সাথেই বাড়ি ছেড়েছিল এবং যারা দ্রুত তাদের সামাজিক রুটিনে ফিরে যেতে পেরেছে সে সকল শিশুরা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় ভুগবে না। “যে ব্যক্তি বোমা হামলা থেকে বেঁচে গেছে এবং কিভাবে তার কাছের কোন আত্নিয় কিংবা স্বজন কিংবা তার বাবা-মা কিংবা যে কোন একজন মারা গেছে সেই শিশুর জন্য পরিস্থিতি খুবই ভিন্ন হবে,” সে বলেন। এই ধরনের আঘাতের জন্য নিবিড় চিকিৎসার প্রয়োজন হবে।

০৬/০৪/২০২২, ১১.৫২ PM

I-Desk

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক যা কোথাও কোথাও I-Desk নামেও পরিচিত। এই ডেস্ক থেকে অবিনশ ব্লগে বিশ্বের চলমান ঘটনা তুলে এনে পেশ করা হয়ে থাকে। আপনিও চাইলে বিশ্বের যে কোন প্রান্ত থেকে আমাদের লিখে পাঠাতে পারেন সম্প্রতি ঘটে যাওয়া যে কোন তথ্য কিংবা ঘটনা সম্পর্কে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *