বিবাহ সমাচার
আমার এক ভাই আমাকে এক বিয়ের কাহিনী শুনিয়েছিল। অভিভূত হয়ে গেছিলাম। এক বৌদ্ধ বিয়েতে দাওয়াত খেতে গিয়ে সে দেখল বরপক্ষ আর কণে পক্ষের মধ্যে তুমুল বিতর্ক চলছে। ঘটনা কি? বিতর্কের বিষয় হোল কতটুকু নগদ দেয়া হবে আর কতটুকু পরে দিলেও বরপক্ষ কন্সিডার করবে। বর নিজেও রয়েছে তার্কিকদের মধ্যে। কণে অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে আছে তার বাবার লাঞ্ছনা আর গ্লানির দৃশ্যের প্রতি। অনেকক্ষণ পর ঠিক হল যেভাবেই হোক অর্ধেক টাকা দেয়া হলে বিয়ে হবে নতুবা নয়। বাবা ভাবছেন কি করে এই অনুষ্ঠানের মধ্যেই উনি টাকা সংগ্রহ করবেন। বর গিয়ে কণেকে বলল,
– “আমি দয়া করে তোমাকে বিয়ে করতে রাজী হলাম”।
সবাই স্তম্ভিত হয়ে শুনলো কথাটা। আর কণে বলল,
– “আমি রাজী হলাম না”।
মেয়ের বাবাসহ সবাই কণেকে বোঝাতে চেষ্টা করল যে, এই বিয়ে ভেঙ্গে গেলে হয়ত মেয়ের বদনাম হয়ে যাবে, আর কখনো বিয়ে হবেনা। কিন্তু মেয়ে বল্ল,
– “বিয়ে না হলে নাইবা হল। এই বিয়েই হতে হবে এমনটা না। ওঁরা বিয়ের আসরেই এরকম আচরণ করছেন, বিয়ের পর কেমন আচরণ করবেন?”
বরপক্ষের লোকজন হম্বিতম্বি করে চলে গেল কিন্তু মেয়ে কিছুতেই রাজী হলোনা। মেয়ের বাবা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন, কণেপক্ষের লোকজন বিমর্ষ। এমনসময় আমন্ত্রিতদের মধ্যে একজন ছেলে এসে বলল,
– “আমার খুব একটা টাকাপয়সা নেই, কিন্তু লেখাপড়া জানি। একটা ছোটখাট চাকরী আছে। আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমি বিনা যৌতুকে ওকে বিয়ে করতে চাই”।
বিয়ে হয়ে গেল। আমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাসের কথা বলি কিন্তু কার্যত এতটুকু বিশ্বাসের পরিচয় আমরা অনেকেই দিতে পারিনা। পারলে হয়ত আমাদের জীবনগুলো অন্যরকম হত।
এক ভাইয়ের কাহিনী খুব মজার। উনি গোঁড়া থেকে বলে আসছেন উনি ওনার শ্বশুরকে বলেছেন উনি যৌতুক নেবেন না আর ওনার বন্ধু আমাদের বলে চলেছেন,
– “আপনারা ওর কথা বিশ্বাস করবেন না”।
বিয়ের দিন গিয়ে দেখি ওনার শ্বশুর ওনার চাহিদার তালিকায় অতিষ্ঠ হয়ে সব দিয়েছেন। কমিউনিটি সেন্টারে পুরুষ আর মহিলাদের খাবারের জায়গার ঠিক মধ্যখানে বিশাল জায়গা জুড়ে গাড়ি থেকে শুরু করে ছুরি বটি পর্যন্ত যা যা দিয়েছেন সব সাজিয়ে রেখে দিয়েছেন যেন সবাই বুঝতে পারে ছেলে কিরকম যৌতুকবিহীন বিবাহ করছে! বর লজ্জায় মাথাই তুলতে পারলোনা সম্পূর্ণ বিয়েতে।
ছেলেমেয়েদের বিয়েতে বাবা মা খুশী হয়ে কিছু দিলে তাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু অনেক ছেলেমেয়েরাই আশু আনন্দের ঝোঁকে ভুলে যায় তাদের বাবা মা’র সামর্থ্যের কথা, তাদের খুশীর কথা ভেবে মুখ বুজে অনেক দুঃখ কষ্ট চেপে যাওয়ার কথা। আপনারা যদি আপনাদের সন্তানদের শুধু ভালোবেসেই কিছু দেন, তাহলে লোকের জানার কি দরকার আপনারা কি দিচ্ছেন বা আদৌ দিচ্ছেন কিনা? আর সব ভালোবাসা বিয়ের দিনই দিয়ে দিতে হবে বলে কি কোন কথা আছে? তার শ্বশুরবাড়ীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তার সুবিধা অসুবিধা দেখা, তার যেকোন প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে দেয়া, এভাবে কি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানো যায়না?
এর উল্টোটাও আমাদের সমাজে খুব কমন। ইসলামে তো যৌতুক প্রথা নেই, তবুও এর কথা সব বিয়েতেই একটা প্রধান আলোচ্য বিষয়। কিন্তু মোহরানা নির্ধারণ করার সময়ও ছেলের সামর্থ্যের প্রতি দৃষ্টি রেখে ঠিক করা হয়না। ফলে কার্যত খুব কম মেয়েই তাদের মোহরানা বুঝে পায়। অথচ রাসুল (সা) বলেছেন, অল্প মোহরানার বিয়েই অধিক বরকতপূর্ণ! মোহরানা যথা সম্ভব দ্রুত আদায় করার মধ্যেই মেয়ের সম্মান।
অন্য এক ভাইয়ের কাহিনী শুনে খুব ভালো লেগেছিল। শুনলাম বিয়ের আসরে বসে পকেট থেকে ৫০,০০০ টাকা বের করে তিনি বললেন,
– “আমি এতটুকুই মোহরানা দিতে পারব। এখন আপনারা মেয়ে দিতে রাজী থাকলে দেন, নইলে আমি চলি”।
কণেপক্ষ আর কি বলবে? একসাথে মোহরানা আদায়ে ওনার বিয়ে হয়ে গেল! আমাদের বাবা মা তখনই সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ পাবেন যখন আমরা তাদের সাহস দেব ধৈর্য্ আর স্থিরতার সাথে, “বিয়ে না হলে নাইবা হল, বিয়ে হতেই হবে বলে তো কোন কথা নেই।” আর বিয়ে হলে যেন সম্মানের সাথে হয়। এতটুকু আত্মসম্মান কি আমরা অর্জন করতে পারিনা?
০৭ /০৫/২০২২, ০৯.০০ AM
