গোলাপ রাজ্যে একদিন
কম সময়ে কাছে কোথাও একদিনে ঘুরে আসতে পারবেন এমন অনেক জায়গাই আছে ঢাকার আশে পাশে। তারমধ্যে খুব সুন্দর আর মন ভালো করে দেয়ার মতো একটি জায়গা হলো গোলাপ গ্রাম। বিশ্বাস করুন, এই গ্রাম আপনার যান্ত্রিক জীবনের অনেকটা ক্লান্তিই দূর করে দিবে।
বাসেও যাওয়া যায় আবার ইঞ্জিন চালিত নৌকা করে যাওয়া যায়। আমার মতে নৌকা করে যাওয়া ভাল। মন ভাল হয়ে যাবে।
ঢাকা শহরের যেকোন প্রান্ত থেকে মিরপুর-১ কিংবা মাজার রোড নেমে রিকশা ঠিক করে দিয়াবাড়ি বটতলা ঘাট যাবেন (এটা মিরপুর এর দিয়াবাড়ি, উত্তরার না)। ভাড়া নেবে ৩০-৪০ টাকা মত।
বটতলা ঘাট থেকে সাদুল্লাহপুর ঘাটের উদ্দেশ্যে ৩০ মিনিট পর পর ইঞ্জিন চালিত নৌকা ছাড়ে। সাদুল্লাহপুর যেতে যেতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা লাগবে। সেখানে জন প্রতি ২০ টাকা করে নিবে।
অথবা হাতে চালানো নৌকা রিজার্ভ করতে পারেন। সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা মত। দিয়াবাড়ি বটতলা ঘাট থেকে সাদুল্লাহপুর ঘাটে যাওয়ার সময়টা আপনি সত্যি মুগ্ধ হয়ে থাকবেন।


সাদুল্লাপুর ঘাটে পৌঁছানোর পর ঘাটের বট গাছের নিচে বসে চা-নাস্তা করে নিতে পারেন। এরপর পুরো গ্রামটা পায়ে হেঁটে ঘুরবেন। আমি যতটা ভেবেছিলাম তার থেকেও বেশি সুন্দর এই গ্রাম। পুরোটাই যেন গোলাপের বাগান। যতদূর যাবেন গোলাপে ঢাকা চারপাশ আপনাকে মুগ্ধ করে রাখবে। পুরোটা গ্রামকে বলা হয়ে থাকে গোলাপ গ্রাম। উঁচু জমিগুলো ছেয়ে আছে গোলাপে। লাল, হলুদ, সাদা—কত বর্ণের যে গোলাপ তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
কিংবা নৌকা থেকে নেমে অটোতে করে ৫ টাকা দিয়ে সোজা গোলাপের বাজারে যেতে পারেন। ওই বাজার থেকেই সারাদেশে গোলাপ ফুল সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ঢাকা ও তার আশে পাশের বেশি ভাগ ফুল এখান থেকেই আসে। শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন ফুলের বাজারগুলোতে গোলাপের প্রধান যোগান দেন এখানকার চাষিরা। গ্রামে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসে গোলাপের হাট। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য ব্যবসায়ী এসে ভিড় জমান সেখানে। জমে উঠে বেচাকেনা, চলে অনেক রাত পর্যন্ত।
গ্রামের সবখানে শুধু ফুলের বাগান। অন্য কিছু চোখে পরে নাই। মন ভাল করার জন্য এর চেয়ে ভাল জায়গা আর হতে পারে না। সারাদিন ফুলের রাজ্যে কাটিয়ে দিলেন। চাইলে গোলাপ ফুলের তোড়া কিংবা মাথায় দেয়ার টায়রা কিনে আনতে পারবেন, খুব সস্তা দাম। ৫০ টা গোলাপ এর দাম মাত্র ৮০-১০০ টাকা।


বাসে যেতে চাইলে মাজার এর সামনে কোনাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ছেড়ে যায়। ওখান থেকে সরাসরি আক্রান বাজার। ভাড়া ২০/২৫ টাকা। আক্রান বাজার থেকে অটোতে করে ফুলের বাজারে কিংবা সাদুল্লাহপুর গ্রাম ১০/১৫ টাকা।
কি কি দেখবেন
গোলাপের ক্ষেত, বিরুলিয়াতে আছে রজনীগন্ধা আর গ্লডিওলার বাগান। বেশ কয়েকটি জমিদারবাড়ি, বিরুলিয়া ব্রিজের গোড়া থেকে হাতের বাম দিকে মিনিট দুয়েক হাঁটলেই সুদর্শন প্রাচীন বটগাছ। রাস্তায় যাওয়ার সময় দেখা পেতে পারেন মহিষের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গাড়িয়াল।
কোথায় খাবেন
সাদুল্লাহপুর যেখানে অটো থামে সেখানেই খাবারের হোটেল আছে। তবে খাবার খুবই নিম্নমানের। ভাল হয় ঢাকা থেকে সঙ্গে করে খাবার নিয়ে গেলে।
বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে আরো লেখা পড়ুন –
অন্যান্য সুযোগ সুবিধা
১০০% সেইফ এন্ড সিকিওর। মেয়েরাও যেতে পারবে। অটো থামার ওখানেই সাদুল্লাহপুর নৌকা ঘাট। পাশেই মাজার সংলগ্ন একটা মসজিদ আছে। এখানে টয়লেটের ব্যাবস্থা আছে। মাজারের ভেতরের পরিবেশটা খুবই ছায়া সুনিবিড়। বিশাল বিশাল দুটো বটগাছের নিচে আড্ডা জমাতে পারেন। গাছের নিচে বসে শীতল বাতাসে গা জুড়াতে জুড়াতে সামনের নৌকা ঘাটের দিকে তাকিয়ে ধানভর্তি নৌকা দেখবেন নদীর বুকে চলাচল করতে। অসাধারন এক মনোরম দৃশ্য।
গোলাপ গ্রাম ভ্রমনের উপযুক্ত সময়
সাদুল্লাহপুরে প্রায় সারা বছর জুড়ে গোলাপ চাষ হয় বলে আপনি গোলাপ গ্রাম ঘুরতে যেতে পারেন যে কোন সময়। তবে বছরের সবটা সময় জুড়ে গোলাপের তেমন দাপট কিন্তু থাকে না। বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র এর দিক দিয়ে শীতকালই হচ্ছে গোলাপ ফুল ফোঁটার সেরা সময়। শীতকালে গোলাপ ফুল অনেক বড় ভাবে পরিস্ফুটিত হয়ে থাকে এবং তখন সাদুল্লাহপুরের সব বাগনই গোলাপে ভরে থাকে। তাই গোলাপ গ্রাম ভ্রমণের সেরা সময় বিবেচনা করলে শীতকালকেই বেছে নেয়া উত্তম।
রুট প্ল্যান-১
টঙ্গি ষ্টেশন থেকে কামারপাড়া হয়ে সিএনজি রিজার্ভ নিয়ে বিরুলিয়া ব্রিজ। ভাড়া ২০০/২৫০ টাকা। বিরুলিয়া ব্রিজ থেকে অটোতে ১০/১৫ টাকা ভাড়ায় আক্রান বাজার, সেখান থেকে অটোতে ১০/১৫ টাকায় সাদুল্লাহপুর। বা ডাইরেক্ট ২০/২৫ টাকায় বিরুলিয়া ব্রিজ থেকে সাদুল্লাহপুর।
রুট প্ল্যান-২
উত্তরা হাউজ বিল্ডিং, নর্থ টাওয়ার বা মাসকট প্লাজা থেকে সোনারগাঁ জনপথ ধরে লেগুনাতে দিয়াবাড়ি, তারপর একটু হেটে মেইনরোড, লোকাল গাড়িতে উঠে বিরুলিয়া ব্রিজ। হেঁটেও যেতে পারবেন। বিরুলিয়া থেকে রুট প্ল্যান-১ এর মত বাকিটা। বা এখান থেকে নৌকা রিজার্ভ নিয়ে সরাসরি সাদুল্লাহপুর।
রুট প্ল্যান-৩
মিরপুর ১ থেকে দিয়াবাড়ি বটতলা। তারপর লোকাল নৌকায় জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় ডাইরেক্ট সাদুল্লাহপুর ঘাট।
ফুট নোট
সব থেকে বেস্ট রুট হচ্ছে রুট প্ল্যান-১। কারণ এইপথে দারুণ সব গোলাপের ক্ষেত। রাস্তার দু’পাশ জুড়েই। একেবারে পুরো রাস্তা। অটো থামিয়ে থামিয়ে সবগুলো গোলাপের বাগান কাভার করতে পারবেন।
* নৌকা কিন্ত সন্ধ্যা ৬ টার পর চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
** ঢাকা থেকে খাবার নিয়ে যেতে পারেন। অবশ্য ঐখানে মুটামুটি মানের বেশ কিছু খাবার হোটেল আছে। দাম ও হাতের নাগালের মধ্যে।
০৯/০৫/২০২২, ০৯.১০ AM
